{{ news.section.title }}
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে প্রস্তুত ইরান: প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক পথে এগোতে ইরান প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনার টেবিলে বসলেও ইরানের জনগণের বৈধ অধিকার ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে তেহরান কোনো আপস করবে না। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে ফোনালাপে পেজেশকিয়ান এই অবস্থান জানান।
রয়টার্স জানিয়েছে, মাখোঁ ফোনালাপে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে পেজেশকিয়ানের সঙ্গে আলোচনা করেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিরাপদ ও অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন এবং ফ্রান্স-ব্রিটেনের যৌথ উদ্যোগে একটি আন্তর্জাতিক মিশনের প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি ইরানকে এই উদ্যোগে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং বিষয়টি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও কথা বলবেন বলে জানান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে রয়টার্স জানায়, পেজেশকিয়ান ফোনালাপে বলেন, তেহরান আন্তর্জাতিক আইন মেনে আঞ্চলিক সংকট সমাধান এবং নিজের অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে কূটনৈতিক পথ অনুসরণ করতে প্রস্তুত। তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাস প্রকাশ করেন। তার অভিযোগ, আলোচনা চলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে, যা তেহরানের দৃষ্টিতে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
এই ফোনালাপ এমন সময়ে হলো, যখন যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে খবর প্রকাশ করেছে অ্যাক্সিওস। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শান্তি প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত পাকিস্তানের একটি সূত্রও এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্রটি জানায়, দুই পক্ষ যুদ্ধ বন্ধের প্রক্রিয়ায় “খুব কাছাকাছি” পৌঁছে গেছে।
অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকটি ১৪ দফার হতে পারে এবং এটি যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করার পাশাপাশি পরবর্তী ৩০ দিনের বিস্তারিত পারমাণবিক আলোচনার ভিত্তি তৈরি করবে। সম্ভাব্য কাঠামোর মধ্যে রয়েছে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সাময়িক স্থগিতাদেশ, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ ফেরত দেওয়া এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ ধাপে ধাপে তুলে নেওয়া।
তবে আলোচনায় এখনও বড় বাধা রয়ে গেছে। অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার মেয়াদ নিয়ে মতপার্থক্য আছে। যুক্তরাষ্ট্র শুরুতে ২০ বছরের স্থগিতাদেশ চাইছিল, ইরান ৫ বছরের প্রস্তাব দিয়েছে; আলোচনায় ১৫ বছরকে সম্ভাব্য আপসের জায়গা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে সরানোর বিষয়টিও সম্ভাব্য বড় ছাড় হিসেবে আলোচনায় আছে।
হরমুজ প্রণালিও এই কূটনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রে রয়েছে। যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের বড় অংশ এই পথ দিয়ে যায়। ফলে হরমুজে অচলাবস্থা শুধু সামরিক সংকট নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও বড় ঝুঁকি। মাখোঁর ফোনালাপেও তাই অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে নেওয়া সামরিক উদ্যোগ ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই স্থগিতাদেশকে সম্ভাব্য চুক্তির জন্য একটি কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখছে হোয়াইট হাউস। তবে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ এখনো বহাল রয়েছে, যা তেহরানের আস্থাহীনতা আরও বাড়াচ্ছে।
ইরানের অবস্থান হলো, তারা আলোচনায় যেতে রাজি, কিন্তু চাপের মুখে আত্মসমর্পণমূলক কোনো সমঝোতা মেনে নেবে না। পেজেশকিয়ানের বক্তব্যেও সেই বার্তাই স্পষ্ট-সংলাপ হতে পারে, তবে ইরানের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা বাদ দিয়ে নয়। তেহরান চাইছে, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ, জব্দ সম্পদ এবং পারমাণবিক কর্মসূচির প্রশ্নকে একসঙ্গে আলোচনায় আনা হোক।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, যুদ্ধ বন্ধের প্রাথমিক সমঝোতার সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা যুক্ত থাকুক। হোয়াইট হাউস ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সম্ভাব্য এক পৃষ্ঠার সমঝোতা নিয়ে তাৎক্ষণিক মন্তব্য করেনি। তবে রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের কাছ থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জবাব আশা করছে।
সব মিলিয়ে, মাখোঁ-পেজেশকিয়ান ফোনালাপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইউরোপীয় শক্তিগুলোও এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে চাইছে। ফ্রান্স হরমুজে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক উদ্যোগের কথা বলছে, পাকিস্তান মধ্যস্থতা করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্ভাব্য এমওইউর কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে তেহরানের অবিশ্বাস, ওয়াশিংটনের কঠোর শর্ত এবং হরমুজে অবরোধ বহাল থাকায় চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো অনিশ্চিত।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স