{{ news.section.title }}
যুক্তরাষ্ট্রে সুপার টাইফুন ‘বাভি’র আঘাতে নিহত ৫
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল গুয়াম ও নর্দার্ন মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জে আঘাত হেনেছে শক্তিশালী সুপার টাইফুন ‘বাভি’, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ঘণ্টায় প্রায় ২৯০ কিলোমিটার বেগের স্থায়ী বাতাস এবং ৩৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দমকা হাওয়া নিয়ে সোমবার (৬ জুলাই) স্থানীয় সময় ঝড়টি নর্দার্ন মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের রোটা (Rota) দ্বীপ অতিক্রম করে। ঝড়ের কারণে গুয়াম, সাইপান, টিনিয়ান ও আশপাশের এলাকায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
মার্কিন ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস (NWS) জানিয়েছে, সুপার টাইফুন বাভি ‘জীবনের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি’ সৃষ্টি করেছে। ঝড়ের কেন্দ্রে ঘণ্টায় ১৮০ মাইল (প্রায় ২৯০ কিলোমিটার) বেগের স্থায়ী বাতাস এবং ২১৫ মাইল (প্রায় ৩৪৬ কিলোমিটার) পর্যন্ত দমকা হাওয়া রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের ভাষায়, এ ধরনের ঝড় ক্যাটাগরি-৫ হারিকেনের সমতুল্য এবং এর প্রভাবে ভবন, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থায় ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে যুক্তরাষ্ট্রের অধীনস্থ রোটা দ্বীপে। ঝড়ের ‘আইওয়াল’ সরাসরি দ্বীপটির ওপর দিয়ে অতিক্রম করায় সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীব্র বাতাস ও মুষলধারে বৃষ্টিপাত হয়েছে। সাইপান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটারেরও বেশি বেগের দমকা হাওয়া রেকর্ড করা হয়েছে। একই সঙ্গে গুয়াম ও নর্দার্ন মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস এবং উপকূলীয় প্লাবনের আশঙ্কা রয়েছে।
আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, ঝড়টি অন্তত ৫১ সেন্টিমিটার (২০ ইঞ্চি) পর্যন্ত বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে। পাশাপাশি সমুদ্রে প্রায় ১১ মিটার উচ্চতার ঢেউ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাস, তীব্র ক্ষয় এবং সামুদ্রিক যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হতে পারে। জেলেদের সমুদ্রে না যেতে এবং সব ধরনের নৌযান নিরাপদ বন্দরে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গুয়ামের গভর্নর লু লিওন গুয়েরেরো বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে অথবা নির্ধারিত আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকার সম্ভাব্য সব ধরনের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা কর্মী, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জরুরি সেবার সদস্যদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
ঝড়ের আগে হাজারো মানুষ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যান। অনেক পরিবার ঘরের জানালা কাঠের পাটাতন দিয়ে বন্ধ করে দেয় এবং খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত করে। বিভিন্ন এলাকায় সুপারমার্কেট, জ্বালানি স্টেশন এবং জরুরি সরঞ্জামের দোকানগুলোতে দীর্ঘ সারি দেখা যায়। স্থানীয় প্রশাসন আগেই স্কুল, সরকারি অফিস এবং বেশিরভাগ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছিল।
আবহাওয়াবিদদের মতে, নর্দার্ন মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের মানুষ এখনও কয়েক মাস আগে আঘাত হানা সুপার টাইফুন সিনলাকু-এর ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সেই ঝড়ে বহু বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয় এবং অনেক এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ফলে নতুন এই সুপার টাইফুন পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট টাইফুন ওয়ার্নিং সেন্টার (JTWC) বাভিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সুপার টাইফুন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং চলমান এল নিনো পরিস্থিতির কারণে ঝড়টি খুব দ্রুত শক্তি অর্জন করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ও তীব্রতা দুটোই বেড়েছে।
বাভি পশ্চিমমুখী অগ্রসর হচ্ছে এবং আগামী কয়েক দিনে এটি ফিলিপাইন ও পূর্ব এশিয়ার আবহাওয়ার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে ঝড়টি স্থলভাগে প্রবেশের পর ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে বলে ধারণা করছেন আবহাওয়াবিদরা। তবুও এর প্রভাবে কয়েক দিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাত, প্রবল বাতাস এবং উপকূলীয় দুর্যোগ অব্যাহত থাকতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি (FEMA) এবং স্থানীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা প্রস্তুত রেখেছে। বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে জরুরি পরিকল্পনাও প্রস্তুত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সূত্রে এখন পর্যন্ত সুপার টাইফুন বাভিতে নিহতের কোনো আনুষ্ঠানিক সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়নি। বিভিন্ন এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার খবর পাওয়া গেলেও উদ্ধার অভিযান চলমান রয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছে।