ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে মৃত বেড়ে ৩৩৪২

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে মৃত বেড়ে ৩৩৪২
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলায় গত ২৪ জুন আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের পর দেশটির মানবিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৩৪২ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ৭৪০ জনেরও বেশি, আর হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে দেশটির ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ভেনেজুয়েলার সরকার জানিয়েছে, রাজধানী কারাকাস, উপকূলীয় লা গুয়াইরা, ইয়ারাকুই, আরাগুয়া এবং আশপাশের কয়েকটি অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় বহুতল ভবন, হাসপাতাল, সরকারি স্থাপনা, সেতু ও সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে।

 

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে রিখটার স্কেলে ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। প্রথম কম্পনের পর মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আগেই দ্বিতীয় ও আরও শক্তিশালী কম্পন শুরু হওয়ায় হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়। এরপর শত শত আফটারশক উদ্ধার অভিযানে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।

 

ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ যত এগোচ্ছে, ততই নতুন নতুন মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে। ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারীরা এখনও বহু এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ অপসারণ করছেন, তবে ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কায় অনেক জায়গায় অভিযান ধীরগতিতে চালাতে হচ্ছে।

 

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, হাজার হাজার মানুষ নিজেদের বাড়িঘর হারিয়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। অনেক পরিবার এখনও ধ্বংসস্তূপের পাশে অপেক্ষা করছেন, যদি নিখোঁজ স্বজনদের জীবিত কিংবা অন্তত মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরায় বহু মানুষ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন।

 

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, উদ্ধার অভিযান এখনও শেষ হয়নি এবং সরকার জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাবে। তিনি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলোর সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সহযোগিতা ভেনেজুয়েলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হাসপাতালগুলোতে আহতদের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। অনেক চিকিৎসাকেন্দ্র নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জরুরি চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিশুদ্ধ পানি এবং জ্বালানির সংকটও দেখা দিয়েছে।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন (PAHO) সতর্ক করেছে, দ্রুত বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা না গেলে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতিতে কলেরা, ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

 

আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে উদ্ধারকারী দল, অনুসন্ধানী কুকুর, ভারী যন্ত্রপাতি, মোবাইল হাসপাতাল এবং জরুরি খাদ্য ও ওষুধ ভেনেজুয়েলায় পাঠিয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করেছে।

 

উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর জীবিত উদ্ধারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনও অলৌকিকভাবে কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, জীবিত কাউকে পাওয়ার সম্ভাবনা ততই কমে আসছে। এজন্য অনেক আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ধীরে ধীরে তাদের অভিযান সমাপ্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে।

 

এদিকে সরকারের দুর্যোগ মোকাবিলা নিয়ে প্রশ্নও উঠছে। অনেক ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দার অভিযোগ, দুর্ঘটনার প্রথম কয়েক ঘণ্টায় উদ্ধার সরঞ্জাম ও ভারী যন্ত্রপাতি পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে অনেক পরিবার নিজেরাই খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনদের উদ্ধারের চেষ্টা করেছে। যদিও সরকার দাবি করেছে, দুর্যোগের পরপরই হাজার হাজার সেনাসদস্য, পুলিশ ও জরুরি সেবাকর্মী মাঠে নামানো হয়েছিল।

 

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ইতিহাসে ভেনেজুয়েলায় এটি সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি। দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক সংকট, দুর্বল অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্যখাতের সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে এত বড় ভূমিকম্প উদ্ধার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমকে আরও জটিল করে তুলেছে।

 

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষ আটকে থাকায় এবং অনেক এলাকায় অনুসন্ধান শেষ না হওয়ায় আগামী দিনগুলোতে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পুনর্বাসন, অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।


সম্পর্কিত নিউজ