হরমুজ সংকটে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বড় প্রভাব পড়ছে: জাপানের প্রধানমন্ত্রী

হরমুজ সংকটে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বড় প্রভাব পড়ছে: জাপানের প্রধানমন্ত্রী
ছবির ক্যাপশান, জাপান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি | ছবি: সংগৃহীত

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এই সংকট এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে “বিরাট প্রভাব” ফেলছে বলে সতর্ক করেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি।

সোমবার অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। সফরকালে জাপান ও অস্ট্রেলিয়া জ্বালানি নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে সহযোগিতা বাড়াতে কয়েকটি চুক্তি সই করেছে।

 

বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে ওই জলপথে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধের মুখে পড়েছে। ইরান এই পথে বাণিজ্যিক চলাচল কঠোরভাবে সীমিত করে রেখেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই এশিয়ার বাজারে যায়। ফলে সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে এশিয়ার আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর।

 

তাকাইচি বলেন, “হরমুজ প্রণালির কার্যকর বন্ধ অবস্থা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বিশাল প্রভাব ফেলছে।” তিনি জানান, পরিস্থিতির জরুরি গুরুত্ব বিবেচনায় জাপান ও অস্ট্রেলিয়া ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখার বিষয়ে একমত হয়েছে।

 

জ্বালানি নিরাপত্তায় টোকিও-ক্যানবেরার উদ্বেগ

অস্ট্রেলিয়া জাপানের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ। জাপানের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে অস্ট্রেলিয়া থেকে। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া জাপানের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির সবচেয়ে বড় বাজার। ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় টোকিও ও ক্যানবেরা-দুই দেশই বিকল্প সরবরাহ, স্থিতিশীল জ্বালানি প্রবাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে হিসাব করছে।

 

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেন, জাপানের মতো অস্ট্রেলিয়াও তরল জ্বালানি ও পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

 

গুরুত্বপূর্ণ খনিজে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা

তাকাইচির তিন দিনের অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রথম দিনেই দুই দেশ জ্বালানি, অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে সহযোগিতা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। অস্ট্রেলিয়া জানিয়েছে, জাপানি অংশীদারিত্ব থাকা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রকল্পগুলোতে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার পর্যন্ত সহায়তা দিতে পারে ক্যানবেরা। মার্কিন ডলারে যার পরিমাণ প্রায় ৯৩৭ মিলিয়ন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে জাপান গ্যালিয়াম, নিকেল, গ্রাফাইট, রেয়ার আর্থস ও ফ্লোরাইটের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের স্থিতিশীল সরবরাহ পেতে পারে। এসব খনিজ সেমিকন্ডাক্টর, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি এবং আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

জাপান সরকার জানিয়েছে, প্রযুক্তি, শিল্প ও নিরাপত্তা খাতে ব্যবহৃত এসব কৌশলগত খনিজের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাই তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার।

 

প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও জোরদার

জাপান ও অস্ট্রেলিয়া-দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশ বদলে যাওয়ায়, বিশেষ করে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কারণে, দুই দেশ সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে। গত মাসে অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর জন্য জাপানের মোগামি-ক্লাস স্টেলথ যুদ্ধজাহাজ সরবরাহে বড় চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়। চুক্তিটির মূল্য ১০ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার, যা প্রায় ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

 

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ সংকট জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ককে আরও কৌশলগত জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। আগে যেখানে দুই দেশের সহযোগিতা মূলত জ্বালানি ও বাণিজ্যকেন্দ্রিক ছিল, এখন তা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, প্রতিরক্ষা, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে।

 

সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট অচলাবস্থা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নয়; এর প্রভাব সরাসরি এশিয়ার জ্বালানি বাজার, শিল্প উৎপাদন, পণ্যমূল্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পড়ছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সতর্কবার্তা সেই বৃহত্তর বাস্তবতাকেই সামনে আনছে।

সূত্র: আল জাজিরা


সম্পর্কিত নিউজ