ওপেক ছাড়ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বৈশ্বিক তেল বাজারে বড় ধাক্কার আশঙ্কা

ওপেক ছাড়ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বৈশ্বিক তেল বাজারে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

সংযুক্ত আরব আমিরাত ওপেক ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। মঙ্গলবার আবুধাবির এই সিদ্ধান্ত তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেকের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান যুদ্ধ ঘিরে নজিরবিহীন জ্বালানি সংকটের মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর ভেতরের মতপার্থক্যও এতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ওপেকের অন্যতম বড় উৎপাদক দেশ। ফলে দেশটির বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জোটটির বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। একই সঙ্গে এটি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে চলমান দূরত্ব আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওপেকের কার্যত নেতৃত্বে রয়েছে সৌদি আরব। এই সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, উপসাগরীয় পথে তেল রপ্তানি স্বাভাবিক হলে সংযুক্ত আরব আমিরাত চাইলে উৎপাদন বাড়াতে পারবে। কারণ ওপেকের কোটা বা উৎপাদন সীমার বাধ্যবাধকতা তখন আর দেশটির ওপর থাকবে না।

 

ঘোষণার পর প্রথম প্রকাশ্য মন্তব্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানিমন্ত্রী সুহাইল মোহাম্মদ আল-মাজরুয়ি রয়টার্সকে বলেন, দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জ্বালানি কৌশল পর্যালোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার দাবি, বিষয়টি নিয়ে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি।

মাজরুয়ি বলেন, “এটি একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত। উৎপাদনের মাত্রা নিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নীতি সতর্কভাবে পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

 

১ মে থেকে ওপেকের বাইরে থাকবে আমিরাত

সংযুক্ত আরব আমিরাত আগামী ১ মে থেকে ওপেক এবং ওপেক প্লাস জোট ছাড়বে। ওপেক প্লাসে ওপেক সদস্যদের পাশাপাশি রাশিয়াসহ কয়েকটি মিত্র তেল উৎপাদক দেশ রয়েছে।

আমিরাতের ঘোষণার পর মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা ওঠানামা করে এবং আগের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কিছুটা কমে আসে। তবে আমিরাতের জ্বালানিমন্ত্রী বলেছেন, হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান সীমাবদ্ধতার কারণে এই ঘোষণার তাৎক্ষণিক বড় বাজারপ্রভাব তিনি আশা করছেন না।

 

ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট। সাধারণ সময়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে ওই পথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ইরানি হুমকি ও জাহাজে হামলার কারণে উপসাগরীয় উৎপাদক দেশগুলো রপ্তানি চালাতে সমস্যায় পড়েছে।

 

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জানিয়েছে, বৈশ্বিক তেল উৎপাদনে ওপেক প্লাসের অংশ মার্চে কমে ৪৪ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল প্রায় ৪৮ শতাংশ। এপ্রিল মাসে উৎপাদন আরও কমতে পারে। আর মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় উৎপাদক বেরিয়ে গেলে জোটটির অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারে।

 

ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক সুবিধা?

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্তকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ওপেকের সমালোচক। ২০১৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে তিনি অভিযোগ করেছিলেন, ওপেক তেলের দাম বাড়িয়ে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে অন্যায় করছে।

 

ট্রাম্প আরও বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেও ওপেক সদস্যরা উচ্চ তেলের দাম চাপিয়ে সেই অবস্থার সুযোগ নেয়। বিশ্লেষকদের মতে, আমিরাতের সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কারণ দেশটি ওপেকের বাইরে গিয়ে উৎপাদন বাড়াতে পারলে বাজারে সরবরাহ বাড়তে পারে, যা তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে।

 

এডিসিবির প্রধান অর্থনীতিবিদ মনিকা মালিক বলেন, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এই সিদ্ধান্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বৈশ্বিক তেল বাজারে নিজের অংশ বাড়ানোর সুযোগ করে দিতে পারে।

 

রাইস্টাডের বিশ্লেষক জর্জ লিয়ন বলেন, সৌদি আরবের বাইরে ওপেকের যে কয়েকটি দেশের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের অন্যতম। তার মতে, জোটের বাইরে গেলে দেশটির উৎপাদন বাড়ানোর আগ্রহ ও সক্ষমতা দুটিই থাকবে। এতে বাজারের প্রধান স্থিতিশীলকারী হিসেবে সৌদি আরবের ভূমিকা কতটা টেকসই থাকবে, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠতে পারে।

 

সৌদি-আমিরাত দূরত্ব আরও স্পষ্ট

একসময় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের মধ্যে নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়েছে। তেলনীতি, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, বিদেশি বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি ও ব্যবসায়িক নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা-সব ক্ষেত্রেই আবুধাবি ও রিয়াদের মধ্যে টানাপোড়েন দেখা যাচ্ছে।

 

সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান ব্যবসা ও আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। একই সঙ্গে দেশটি ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের একটি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবুধাবি মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে নিজস্ব প্রভাববলয় তৈরির চেষ্টা করেছে।

 

ইরান যুদ্ধের সময় হামলার মুখে পড়ার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন করে দেশটি। আবুধাবি মনে করে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক তাকে আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ বজায় রাখতে সহায়তা করে।

 

এদিকে মঙ্গলবার সৌদি আরবে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের নেতারা বৈঠক করেছেন। উপসাগরীয় এক কর্মকর্তার মতে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো যে হাজার হাজার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়েছে, তার জবাব কীভাবে দেওয়া হবে-তা নিয়েই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

 

সব মিলিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্ত শুধু তেল বাজারের ঘটনা নয়। এটি উপসাগরীয় রাজনীতির ভেতরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সৌদি নেতৃত্বের ওপর চাপ, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কৌশল এবং ইরান যুদ্ধ-পরবর্তী নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক হলে এই সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও মূল্যনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

 

সূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ