ইয়েমেন উপকূল থেকে তেলবাহী ট্যাংকার ছিনতাই

ইয়েমেন উপকূল থেকে তেলবাহী ট্যাংকার ছিনতাই
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ইয়েমেনের শাবওয়া প্রদেশের উপকূল থেকে এম/টি ইউরেকা নামের একটি তেলবাহী ট্যাংকার ছিনতাইয়ের দাবি করেছে দেশটির উপকূলরক্ষী বাহিনী। ইয়েমেনি কোস্টগার্ড জানিয়েছে, অজ্ঞাত সশস্ত্র ব্যক্তিরা জাহাজটিতে উঠে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং সেটিকে এডেন উপসাগর হয়ে সোমালিয়া জলসীমার দিকে নিয়ে যেতে শুরু করে। ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর ও সোমালিয়া উপকূলজুড়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নতুন করে নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

ইয়েমেনের কোস্টগার্ড বলেছে, ট্যাংকারটির অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছে এবং জাহাজটি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে জাহাজে থাকা ক্রুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। তবে কারা এই ছিনতাইয়ে জড়িত, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠীও দায় স্বীকার করেনি।

 

সন্দেহজনক নৌযান দেখা যায় মুকাল্লার কাছে

ঘটনার আগে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস বা ইউকেএমটিও ইয়েমেন উপকূলের কাছে সন্দেহজনক তৎপরতার খবর জানায়। সংস্থাটি বলেছে, ইয়েমেনের আল-মুকাল্লা বন্দর থেকে প্রায় ৮৪ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ থেকে বার্তা পাওয়া যায়। জাহাজটির ক্যাপ্টেন জানান, একটি সবুজ রঙের ছোট নৌকা বা স্কিফ এবং একটি সাদা মাছ ধরার নৌযান জাহাজটির ৫০০ মিটারের মধ্যে চলে আসে। এরপর ইউকেএমটিও ওই অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সতর্ক থাকতে এবং সন্দেহজনক তৎপরতা দেখলে দ্রুত জানাতে পরামর্শ দেয়।

 

আল আরাবিয়া ও জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউকেএমটিওর সতর্কতার পরই ইয়েমেনি কোস্টগার্ড এম/টি ইউরেকা ট্যাংকার ছিনতাইয়ের বিষয়টি জানায়। তবে বাল্ক ক্যারিয়ারের সন্দেহজনক তৎপরতা এবং ইউরেকা ট্যাংকার ছিনতাই একই ঘটনার অংশ কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

 

এডেন উপসাগরে নতুন নিরাপত্তা সংকট

এডেন উপসাগর ও ইয়েমেন উপকূল দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। এই পথ দিয়ে ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হুতি বিদ্রোহীদের হামলা, ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, সোমালি জলদস্যুদের পুনরুত্থানের আশঙ্কা এবং আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনার কারণে এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক নৌপথ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সোমালিয়া উপকূলের কাছাকাছি কয়েকটি জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনায় জলদস্যুতার পুনরুত্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২১ এপ্রিল Honour 25 নামের একটি মোটর ট্যাংকার ছিনতাইয়ের পর ২৬ এপ্রিল Sward নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজও দখলে নেওয়ার খবর আসে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত মেরিটাইম সিকিউরিটি সেন্টার ইন্ডিয়ান ওশান ওই ঘটনাগুলো নিয়ে জাহাজগুলোকে উচ্চ সতর্কতায় চলাচলের পরামর্শ দেয়।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, সোমালি জলদস্যুরা অতীতে মাদারশিপ, ছোট দ্রুতগতির নৌকা, জিপিএস ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবহার করে দীর্ঘ দূরত্বে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাত। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে একই ধরনের পদ্ধতির ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। তবে এম/টি ইউরেকা ছিনতাইয়ের সঙ্গে সোমালি জলদস্যুদের সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

 

হুতি হামলা নাকি জলদস্যুতা-এখনো অস্পষ্ট

ইয়েমেন উপকূলের ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো-এটি কি জলদস্যুতা, নাকি ইয়েমেনের চলমান সংঘাতের কোনো অংশ? হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব অঞ্চলে বহুবার বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। তবে ইউরেকা ট্যাংকার ছিনতাইয়ের ক্ষেত্রে ইয়েমেনি কোস্টগার্ড এখনো শুধু “অজ্ঞাত সশস্ত্র ব্যক্তি” বলেছে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে দায়ী করার মতো নিশ্চিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

 

তবে ঘটনাস্থলের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। শাবওয়া ও মুকাল্লা সংলগ্ন উপকূল ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় সামুদ্রিক রুটের কাছে। এই পথ দিয়ে এডেন উপসাগরে প্রবেশ করা যায়, আর সেখান থেকে সোমালিয়া উপকূলের দিকে যাওয়া সহজ। তাই জাহাজটি সোমালিয়া জলসীমার দিকে নেওয়ার তথ্য জলদস্যুতার আশঙ্কাকে আরও জোরালো করছে।

 

তেলবাহী জাহাজ ছিনতাইয়ের ঝুঁকি কেন বড়

তেলবাহী ট্যাংকার ছিনতাই শুধু জাহাজ ও ক্রুদের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ, বীমা খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং পরিবেশগত ঝুঁকিও জড়িত। তেলবাহী জাহাজে হামলা বা ছিনতাই হলে সমুদ্রদূষণ, অগ্নিকাণ্ড, জাহাজের ক্ষতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিলম্বের আশঙ্কা তৈরি হয়।

 

এডেন উপসাগর, বাব আল-মান্দেব ও সোমালিয়া উপকূল বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। এ অঞ্চলে অনিরাপত্তা বাড়লে জাহাজ কোম্পানিগুলোকে বিকল্প দীর্ঘ রুট ব্যবহার করতে হতে পারে। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ে, পণ্য পরিবহনের সময় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়েও খরচের চাপ পড়ে।

 

অতীতেও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল ইয়েমেন উপকূল

ইয়েমেন উপকূল অতীতেও তেলবাহী জাহাজ হামলার জন্য আলোচিত হয়েছে। ২০০২ সালে ইয়েমেনের আল-ধাব্বা বন্দরের কাছে ফরাসি তেলবাহী ট্যাংকার এমভি লিমবার্গে আত্মঘাতী হামলা হয়। ওই হামলায় জাহাজে আগুন ধরে যায় এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বড় নিরাপত্তা আতঙ্ক তৈরি হয়। যদিও বর্তমান এম/টি ইউরেকা ছিনতাইয়ের ধরন ভিন্ন, তবু ইয়েমেন উপকূলের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।

 

আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে সতর্কতা

ইউকেএমটিও, সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা এবং আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ এখন ওই এলাকায় চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছে। বিশেষ করে ছোট নৌকা, মাছ ধরার ট্রলার বা দ্রুতগতির স্কিফ যদি বাণিজ্যিক জাহাজের খুব কাছে চলে আসে, তাহলে তা দ্রুত রিপোর্ট করতে বলা হচ্ছে।

 

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, লোহিত সাগর ও হরমুজ সংকটের পাশাপাশি এডেন উপসাগরেও নতুন করে সামুদ্রিক নিরাপত্তা চাপ তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর নজর যখন মধ্যপ্রাচ্যের অন্য উত্তপ্ত জলপথে ব্যস্ত, তখন জলদস্যু বা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে-এমন আশঙ্কাও করছেন বিশ্লেষকেরা।

 

এম/টি ইউরেকা ট্যাংকার ছিনতাইয়ের ঘটনা ইয়েমেন উপকূল ও এডেন উপসাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। এখনো হামলাকারীদের পরিচয় নিশ্চিত নয়, তবে জাহাজটিকে সোমালিয়া জলসীমার দিকে নেওয়ার তথ্য জলদস্যুতার সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করছে, মধ্যপ্রাচ্য ও হর্ন অব আফ্রিকা ঘিরে সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

জাহাজটি উদ্ধার, ক্রুদের নিরাপত্তা এবং হামলাকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করার ওপর এখন আন্তর্জাতিক নজর থাকবে। ঘটনাটি যদি জলদস্যুতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে সোমালিয়া উপকূলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে নতুন করে উচ্চ সতর্কতা জারি হতে পারে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ