বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার তিন শর্ত জানালেন আইনজীবী শিশির মনির

বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার তিন শর্ত জানালেন আইনজীবী শিশির মনির
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব বলে মনে করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির। তবে এজন্য প্রয়োজন শক্তিশালী আইনি প্রস্তুতি, নির্ভুল তথ্য উপস্থাপন এবং উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা। তার মতে, এই তিনটি শর্ত পূরণ করা গেলে বেনজীর আহমেদের প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সফল হতে পারে।

সোমবার (১৫ জুন) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া ‘বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া: একটি সারসংক্ষেপ’ শীর্ষক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।

 

শিশির মনির জানান, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বর্তমানে কোনো কার্যকর দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ (এক্সট্রাডিশন) চুক্তি নেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে, একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দেশে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। তিনি বলেন, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও ইউএইর মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন সিকিউরিটি কো-অপারেশন’ এবং ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন ট্রান্সফার অব সেন্টেন্সড প্রিজনার্স’ বিচারিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে।

 

তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন এ ধরনের প্রক্রিয়া পরিচালনার সুযোগ রেখে দিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘এক্সট্রাডিশন অ্যাক্ট, ১৯৭৪’-এর ধারা ৪ অনুযায়ী সরকার চাইলে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে আইনের আওতায় প্রত্যর্পণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। ফলে কেবল চুক্তি না থাকার বিষয়টিকে বাধা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

 

ফেসবুক পোস্টে শিশির মনির প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপও তুলে ধরেন। তিনি জানান, ইউএইর আইনের অধীনে গ্রেফতারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাতে হবে। এই আবেদন কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে পাঠানোর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

তার বর্ণনা অনুযায়ী, এ প্রক্রিয়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণের প্রস্তাব প্রস্তুত করবে। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা কূটনৈতিক মাধ্যমে ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) পুরো প্রক্রিয়ায় সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবে।

 

প্রত্যর্পণ আবেদনের সঙ্গে কোন কোন নথি সংযুক্ত করতে হবে, সে বিষয়েও বিস্তারিত উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, আদালতের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা, এফআইআর, চার্জশিট অথবা তদন্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ, অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় ও নাগরিকত্বসংক্রান্ত তথ্য, অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ, সংশ্লিষ্ট আইন এবং অভিযোগের সমর্থনে থাকা প্রমাণাদি আবেদনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এসব নথি যত শক্তিশালী ও সুসংগঠিত হবে, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া তত বেশি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

 

শিশির মনির আরও বলেন, বাংলাদেশ থেকে প্রত্যর্পণ আবেদন পাওয়ার পর ইউএইর আদালত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যাচাই করবে। প্রথমত, অভিযোগ করা অপরাধটি ইউএইর আইনেও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কি না, অর্থাৎ ‘ডুয়াল ক্রিমিনালিটি’ শর্ত পূরণ হয়েছে কি না। দ্বিতীয়ত, মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না তা খতিয়ে দেখা হবে। তৃতীয়ত, অভিযুক্তকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হলে তিনি ন্যায়সঙ্গত ও নিরপেক্ষ বিচার পাবেন কি না, সে বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

 

নিজের বক্তব্যের পক্ষে অতীতের একটি উদাহরণও তুলে ধরেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খান হত্যা মামলার দুই আসামি মোহসিন মিয়া ও আরিফ সরকারকে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে দুবাই থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। ওই ঘটনা প্রমাণ করে যে, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সহযোগিতা থাকলে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সফল হওয়া সম্ভব।

 

সবশেষে শিশির মনির জোর দিয়ে বলেন, বেনজীর আহমেদের সফল প্রত্যর্পণ মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। প্রথমত, নিখুঁত ও শক্তিশালী আইনি নথিপত্র প্রস্তুত করা। দ্বিতীয়ত, অভিযুক্তের পরিচয় ও মামলার তথ্য নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করা। তৃতীয়ত, ধারাবাহিক ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা বজায় রাখা। তার মতে, এই তিন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সফল হলে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করা সম্ভব হবে।


সম্পর্কিত নিউজ