বিশ্ববাজারে আরও কমলো তেলের দাম

বিশ্ববাজারে আরও কমলো তেলের দাম
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতির খবর প্রকাশের পর বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমার সম্ভাবনা এবং হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধারের আশাবাদে তেলের দাম চার মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

বুধবার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৭১ দশমিক ৫৭ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৩২ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৬৮ দশমিক ৫৮ ডলারে নেমে আসে। এটি গত চার মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন মূল্য।

 

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার কারণে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল। তবে এখন পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। তিনি বলেন, দুই পক্ষের মূল লক্ষ্য হচ্ছে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ-চলাচল নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি করা।

 

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও বলেছেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে তেল পরিবহন প্রায় যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরে এসেছে। তাঁর মতে, জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত উন্নত হচ্ছে।

 

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বহন করে। গত কয়েক মাস ধরে এই প্রণালিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। বহু জাহাজ আটকে পড়ে এবং বিভিন্ন দেশ তাদের কৌশলগত তেল মজুত ব্যবহার করতে বাধ্য হয়।

 

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বাণিজ্যিক তেলের মজুত ২০১৮ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। সাধারণত মজুত কমে গেলে তেলের দাম বাড়ার কথা থাকলেও বাজার এখন মূলত ভবিষ্যৎ সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে। ফলে সাময়িক সরবরাহ সংকটের পরিবর্তে ভবিষ্যৎ অতিরিক্ত সরবরাহের সম্ভাবনাই বাজারে বেশি প্রভাব ফেলছে।

 

অন্যদিকে ওপেক প্লাস জোটের আসন্ন বৈঠকও তেলের বাজারে বড় ভূমিকা রাখছে। আগামী রোববার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বৈঠকে আগস্ট মাস থেকে উৎপাদন আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

 

সৌদি আরব, রাশিয়া এবং অন্যান্য বড় উৎপাদক দেশগুলো যদি উৎপাদন বৃদ্ধি করে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ তৈরি হতে পারে। এতে আগামী কয়েক মাসেও তেলের দাম চাপে থাকতে পারে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

 

আইএনজি কমোডিটি স্ট্র্যাটেজিস্টদের মতে, বাজার এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধঝুঁকির পরিবর্তে সরবরাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনা মূল্যায়ন করছে। এ কারণে সাম্প্রতিক সময়ে তেলের বাজারে বিক্রির চাপ বেড়েছে।

 

তবে বিশ্লেষকদের একাংশ সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে আবারও কোনো সামরিক ঘটনা বা নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হলে তেলের দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। কারণ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসেনি।

 

জ্বালানি বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ওপেক প্লাসের উৎপাদন নীতিই আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের দিক নির্ধারণ করবে। বর্তমানে বাজারে স্বস্তি ফিরলেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি অনিশ্চয়তামুক্ত নয়।


সম্পর্কিত নিউজ