{{ news.section.title }}
স্পেনে তীব্র তাপপ্রবাহে জুনেই প্রাণ গেল এক হাজারের বেশি মানুষের
স্পেনে চলতি বছরের জুন মাসে তীব্র তাপপ্রবাহে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুন মাসেই উচ্চ তাপমাত্রার কারণে ১ হাজার ২৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা ২০১৫ সালে এ ধরনের হিসাব সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর জুন মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ ইউরোপের দেশগুলোকে নতুন এক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
স্পেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দৈনিক মৃত্যুহার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ‘মোমো’ অতিরিক্ত মৃত্যুর হিসাব বিশ্লেষণ করে এই তথ্য প্রকাশ করেছে। এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সময়ে স্বাভাবিকভাবে যত মানুষের মৃত্যুর কথা, বাস্তবে তার চেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে সেই অতিরিক্ত মৃত্যুকে তাপপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ প্রতিটি মৃত্যুর চিকিৎসা সনদে ‘তাপজনিত মৃত্যু’ লেখা না থাকলেও পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে এ হিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত জুনে স্পেনে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় গড়ে ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। দেশটির আবহাওয়া সংস্থা এইমেট (AEMET) জানিয়েছে, ১৯৬১ সালের পর এটি ছিল স্পেনের দ্বিতীয় উষ্ণতম জুন মাস। শুধু ২০২৫ সালের জুন মাস এর চেয়ে বেশি উষ্ণ ছিল।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তাপপ্রবাহে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের প্রায় সবাই ছিলেন বয়স্ক। মোট ১ হাজার ২৮ জনের মধ্যে ১ হাজার ২২ জনের বয়স ছিল ৬৫ বছরের বেশি। এদের মধ্যে ৭২০ জনের বয়স ছিল ৮৫ বছরেরও বেশি। মাত্র একজন ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়স্ক মানুষের শরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলকভাবে কম সক্ষম। তাদের রক্তসঞ্চালন, ঘাম উৎপাদন এবং শরীরের স্বাভাবিক শীতলীকরণ প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে অতিরিক্ত গরমের সময় তারা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন।
সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে স্পেনের উত্তর ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে। কাতালোনিয়া অঞ্চলে ২১৮ জন এবং বাস্ক অঞ্চলে ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। সাধারণত দেশের দক্ষিণাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ তাপমাত্রা দেখা গেলেও উত্তরাঞ্চলের মানুষ এত দীর্ঘ সময়ের চরম গরমে অভ্যস্ত নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
জুনের ২১ তারিখের পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। ওই সময় থেকেই একটি শক্তিশালী তাপপ্রবাহ পুরো স্পেনে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকটি অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে। কিছু এলাকায় ৪৩ ডিগ্রির কাছাকাছি তাপমাত্রাও রেকর্ড করা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, ২৩ জুন ছিল সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম উষ্ণ দিন। বহু আবহাওয়া কেন্দ্রে জুন মাসের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে যায়। শুধু দিনের তাপমাত্রাই নয়, রাতের তাপমাত্রাও অস্বাভাবিকভাবে বেশি ছিল। অনেক এলাকায় রাতেও তাপমাত্রা ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামেনি। এই ধরনের ‘উষ্ণ রাত’ মানুষের শরীরকে স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ দেয় না, ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
স্পেনের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ১৯৬১ সালের পর থেকে সবচেয়ে উষ্ণ ১৩টি জুন মাসের সবগুলোই ২১ শতকে ঘটেছে। বিজ্ঞানীরা এটিকে দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়নের স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনই এ ধরনের তাপপ্রবাহকে আরও ঘন ঘন এবং তীব্র করে তুলছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে ইউরোপজুড়ে সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহ মানবস্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। শুধু স্পেন নয়, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশেও উচ্চ তাপমাত্রা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
যদিও জুন মাসে মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড সৃষ্টি করেছে, তবুও স্পেনের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ নয়। ২০২২ সালের জুলাই মাসে দেশটিতে তাপপ্রবাহজনিত কারণে ২ হাজার ২১৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া গত বছরের আগস্টেও ২ হাজার ১৮৪ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপপ্রবাহে মৃত্যুর ঘটনা প্রায়ই সরাসরি ধরা পড়ে না। অনেক ক্ষেত্রে হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি জটিলতা বা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যাকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু অতিরিক্ত তাপমাত্রা এসব রোগকে মারাত্মক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।
স্পেন সরকার ইতোমধ্যে জাতীয় তাপ প্রতিরোধ পরিকল্পনা চালু করেছে। বয়স্ক মানুষ, শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ পর্যাপ্ত পানি পান, দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে বাইরে না যাওয়া এবং শীতল স্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। আবহাওয়া সংস্থা এইমেট জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আবারও উষ্ণ বায়ুপ্রবাহ স্পেনে প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে নতুন একটি তাপপ্রবাহ শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা আবারও দিনের পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রাকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্পেনের সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতি শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী তৈরি হওয়া নতুন বাস্তবতার একটি উদাহরণ। বিশেষ করে ইউরোপের মতো উন্নত অঞ্চলেও যখন তাপপ্রবাহে এক মাসে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, তখন ভবিষ্যতে আরও তীব্র আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এ ধরনের প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ আগামী বছরগুলোতে আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে এবং এর প্রভাব আরও মারাত্মক হতে পারে।