বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় ২৫ বছরের সর্বনিম্ন পতন: আরএসএফের সতর্কবার্তা

বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় ২৫ বছরের সর্বনিম্ন পতন: আরএসএফের সতর্কবার্তা
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা গত ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিচে নেমে গেছে বলে জানিয়েছে প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস বা আরএসএফ। সংগঠনটির সর্বশেষ বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবছর ১৮০টি দেশের সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে, তা মূল্যায়ন করে এই সূচক প্রকাশ করে আরএসএফ। সূচকে দেশগুলোর অবস্থা পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়-‘ভালো’, ‘সন্তোষজনক’, ‘সমস্যাজনক’, ‘কঠিন’ এবং ‘অত্যন্ত গুরুতর’।

 

২০০২ সালে সূচক প্রকাশ শুরু হওয়ার পর এবারই প্রথম বিশ্বের অর্ধেকের বেশি দেশ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ‘কঠিন’ বা ‘অত্যন্ত গুরুতর’ অবস্থায় পড়েছে। আরএসএফ বলছে, এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতাকে ক্রমেই অপরাধ হিসেবে দেখানোর প্রবণতা বাড়ছে।

 

ভালো অবস্থানে মাত্র সাত দেশ

সূচকে মাত্র সাতটি দেশকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ‘ভালো’ অবস্থানে রাখা হয়েছে। এর বেশির ভাগই নর্ডিক বা উত্তর ইউরোপীয় দেশ। তালিকার শীর্ষ তিনে রয়েছে নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস ও এস্তোনিয়া।

 

ফ্রান্স ২৫তম অবস্থানে রয়েছে এবং দেশটির পরিস্থিতিকে ‘সন্তোষজনক’ বলা হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে ৬৪তম অবস্থানে, যা ‘সমস্যাজনক’ হিসেবে চিহ্নিত। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্র সাত ধাপ পিছিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

আরএসএফের ভাষ্য, ট্রাম্প সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তার ধারাবাহিক আক্রমণকে একটি ‘পদ্ধতিগত নীতিতে’ পরিণত করেছেন। সংগঠনটি উদাহরণ হিসেবে সালভাদরীয় সাংবাদিক মারিও গুয়েভারার ঘটনাও তুলে ধরেছে। অভিবাসনবিরোধী অভিযানের প্রতিবাদ কভার করার সময় তাকে আটক করা হয় এবং পরে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্থগিতের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

লাতিন আমেরিকায় বড় পতন

লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশের অবস্থাও দ্রুত অবনতি হয়েছে। আর্জেন্টিনা ১১ ধাপ পিছিয়ে ৯৮তম অবস্থানে নেমেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের শাসনামলে গণমাধ্যমের ওপর চাপ বাড়ার বিষয়টি তুলে ধরেছে আরএসএফ।

 

এল সালভাদরের অবস্থান আরও উদ্বেগজনক। দেশটি এখন ১৪৩তম অবস্থানে। ২০১৪ সালের পর থেকে দেশটি ১০৫ ধাপ পিছিয়েছে। অপরাধী গোষ্ঠী মারাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পর দেশটিতে জরুরি আইন, নিরাপত্তা অভিযান ও তথ্যপ্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ে, যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় বড় প্রভাব ফেলেছে।

 

সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চল

আরএসএফ জানিয়েছে, পূর্ব ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য এখনো সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চল। গত ২৫ বছর ধরেই এই দুই অঞ্চলে সাংবাদিকতার পরিবেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

 

সূচকের নিচের দিকের দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে রাশিয়া ও ইরান। রাশিয়া ১৭২তম এবং ইরান ১৭৭তম অবস্থানে আছে। এই দুই দেশে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, গ্রেপ্তার, সেন্সরশিপ এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর দমন-পীড়নকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

যুদ্ধ ও তথ্যপ্রবাহে বাধা বড় কারণ

আরএসএফ বলছে, চলমান যুদ্ধ, সংঘাত এবং তথ্য পাওয়ার অধিকারে বাধা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতিবেদনে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও লেবাননে সাংবাদিকদের ওপর ইসরায়েলি হামলার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সূচকে ইসরায়েল রয়েছে ১১৬তম অবস্থানে।

 

সংগঠনটির দাবি, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ২২০ জনের বেশি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ৭০ জন দায়িত্ব পালনকালে নিহত হন বলে আরএসএফ জানিয়েছে।

 

সাংবাদিকতাকে অপরাধ বানানোর প্রবণতা

আরএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের বহু দেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইন, জরুরি আইন এবং সাধারণ আইনের অপব্যবহার বাড়ছে। এতে সাংবাদিকতা ধীরে ধীরে অপরাধীকরণের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

 

সংগঠনটির হিসাবে, ১৮০টির মধ্যে ১১০টির বেশি দেশে কোনো না কোনোভাবে গণমাধ্যমকর্মীদের অপরাধী হিসেবে দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। এর মধ্যে ভারত, মিসর, জর্জিয়া, তুরস্ক ও হংকংকে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সূচকে ভারতের অবস্থান ১৫৭তম, মিসর ১৬৯তম, জর্জিয়া ১৩৫তম, তুরস্ক ১৬৩তম এবং হংকং ১৪০তম।

 

‘নীরবতা মানে সমর্থন’

আরএসএফের সম্পাদকীয় পরিচালক অ্যান বোসান্দে বলেন, তথ্য জানার অধিকারের ওপর আক্রমণ এখন আগের চেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময় ও জটিল হয়েছে। তবে যারা এসব আক্রমণ করছে, তারা এখন আর আড়ালে নেই। তার মতে, কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র, অদক্ষ বা যোগসাজশকারী রাজনৈতিক শক্তি, লোভী অর্থনৈতিক গোষ্ঠী এবং পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণহীন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম-সব মিলেই বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করছে।

 

তিনি গণতান্ত্রিক সরকার ও নাগরিকদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে সাংবাদিকদের সুরক্ষায় শক্তিশালী নিশ্চয়তা ও কার্যকর নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

 

বোসান্দে বলেন, বর্তমান সুরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। আন্তর্জাতিক আইন দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ছে। তার ভাষায়, নিষ্ক্রিয় থাকা মানে এই প্রবণতাকে মেনে নেওয়া। তবে কর্তৃত্ববাদ ছড়িয়ে পড়া অনিবার্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 

সব মিলিয়ে আরএসএফের এই সূচক বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতা পেশার জন্য বড় সতর্কবার্তা। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্র বা স্বৈরশাসিত দেশের সমস্যা নয়, গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও রাজনৈতিক চাপ, আইনি হয়রানি, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণহীনতা সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে নতুনভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

 

সূত্র: আরএসএফ


সম্পর্কিত নিউজ