{{ news.section.title }}
নৌ অবরোধে ৪৫ জাহাজ ঘুরিয়ে দেওয়ার দাবি সেন্টকমের
ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ অবরোধে এখন পর্যন্ত ৪৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে বা বন্দরে ফিরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড, সেন্টকম। সংস্থাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানায়, মার্কিন বাহিনী আন্তর্জাতিক জলসীমায় টহল অব্যাহত রেখেছে এবং ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে ঘোষিত অবরোধ বাস্তবায়ন করছে। আল জাজিরা ও ডন সেন্টকমের এই দাবির খবর প্রকাশ করেছে।
সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা বা অবরোধের নিয়ম অমান্য করে ইরানি বন্দরের দিকে যাওয়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে থামানো, ঘুরিয়ে দেওয়া বা বন্দরে ফেরত পাঠানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো ইরানের বন্দরভিত্তিক বাণিজ্য, বিশেষ করে জ্বালানি ও নিষেধাজ্ঞাভুক্ত পণ্য পরিবহন সীমিত করা। তবে ইরান শুরু থেকেই এই অবরোধকে অবৈধ ও ‘জলদস্যুতার’ শামিল বলে আখ্যা দিয়ে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্র গত ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানের সব বন্দরের দিকে যাওয়া ও সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর করে। সেন্টকম তখন জানিয়েছিল, অবরোধটি ইরানি বন্দরে যাওয়া বা সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে; তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অ-ইরানি গন্তব্যে চলাচলকারী জাহাজের স্বাধীন নৌচলাচল বাধাগ্রস্ত করা হবে না। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, অনুমোদন ছাড়া অবরুদ্ধ এলাকায় ঢোকা বা বের হওয়া জাহাজ “interception, diversion and capture” বা আটক, ঘুরিয়ে দেওয়া ও জব্দের ঝুঁকিতে থাকবে।
নৌ অবরোধ কার্যকর হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন জাহাজ আটক, ঘুরিয়ে দেওয়া বা যাচাইয়ের দাবি করছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, গত ২৫ এপ্রিল আরব সাগরে ‘সেভান’ নামের একটি জাহাজকে মার্কিন বাহিনী আটক করে এবং সেটিকে ইরানের দিকে ফেরত যেতে নির্দেশ দেয়। ওই সময় সেন্টকমের দাবি ছিল, অবরোধ শুরুর পর ৩৭টি জাহাজ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন হিসাবে সেই সংখ্যা ৪৫-এ পৌঁছেছে।
এর মধ্যে সব জাহাজ আটক বা জব্দ করা হয়নি। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী ‘ব্লু স্টার থ্রি’ নামের একটি পণ্যবাহী জাহাজে ওঠে তল্লাশি চালালেও পরে সেটি ছেড়ে দেয়, কারণ যাচাইয়ে দেখা যায় জাহাজটি ইরানের দিকে যাচ্ছিল না। এ ঘটনা দেখিয়েছে, অবরোধ বাস্তবায়নের সময় ভুল শনাক্তকরণ বা অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও রয়েছে।
অবরোধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে ইরানের তেল রপ্তানিতে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে ইরানের তেল রপ্তানি কমেছে এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ট্যাংকারে আটকে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের স্থলভাগের সংরক্ষণক্ষমতা চাপের মুখে পড়ায় তেল ভাসমান মজুতে রাখতে হচ্ছে।
তবে অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান-সংশ্লিষ্ট কিছু ছোট জাহাজ ও কথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ নানা কৌশলে অবরোধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। কিছু জাহাজ ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা, পরিচয় গোপন করা, উপকূলীয় রুট ব্যবহার বা তৃতীয় দেশের বন্দরের মাধ্যমে চলাচলের পথ নিচ্ছে।
ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধ আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবৈধ হস্তক্ষেপ। আল জাজিরার প্রতিবেদনে ইরানি সামরিক বাহিনীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোর নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে না। তেহরানের এই হুঁশিয়ারি হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই রুটে উত্তেজনা বাড়লে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে দ্রুত প্রভাব পড়ে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল কমেছে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। আল জাজিরা আগের এক বিশ্লেষণে জানিয়েছিল, সংঘাত শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে কয়েকশ জাহাজ চলাচল করলেও বহু জাহাজ হামলা বা নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতাও বাড়ায়। জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বীমা খরচ, শিপিং ব্যয়, পরিবহন সময় এবং সরবরাহ ঝুঁকি বাড়ে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত তেলের দাম, শিল্প উৎপাদন ব্যয় ও ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যস্ফীতিতে পড়তে পারে।
সেন্টকমের ৪৫ জাহাজ ঘুরিয়ে দেওয়ার দাবি তাই শুধু সামরিক তথ্য নয়; এটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের অর্থনৈতিক মাত্রাও সামনে আনে। ওয়াশিংটন বলছে, অবরোধের মাধ্যমে ইরানের যুদ্ধ অর্থায়ন ও জ্বালানি আয়ের পথ সংকুচিত করা হচ্ছে। অন্যদিকে তেহরান এটিকে আগ্রাসী, অবৈধ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই অবরোধ কতদিন চলবে এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা আরও বাড়বে কি না। যুক্তরাষ্ট্র যদি অবরোধ আরও কঠোর করে এবং ইরান পাল্টা পদক্ষেপ নেয়, তাহলে বৈশ্বিক নৌপথ, জ্বালানি বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা