ইরানের জন্য স্থল বাণিজ্য পথ খুলে দিল পাকিস্তান

ইরানের জন্য স্থল বাণিজ্য পথ খুলে দিল পাকিস্তান
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সমুদ্রবন্দর ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের মধ্যে তেহরানের জন্য নতুন স্থল বাণিজ্যপথ খুলে দিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের এই সিদ্ধান্তের ফলে তৃতীয় দেশ থেকে আসা পণ্য পাকিস্তানের বন্দর ও সড়কপথ ব্যবহার করে ইরানে পৌঁছাতে পারবে।

যুদ্ধ ও অবরোধে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের অর্থনীতির জন্য এটিকে গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে-পাকিস্তানের এই পদক্ষেপ কি যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী অর্থনৈতিক চাপকে দুর্বল করে দেবে?

 

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ২৫ এপ্রিল Transit of Goods through Territory of Pakistan Order 2026 জারি করে। আদেশটি সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়। এর আওতায় তৃতীয় দেশ থেকে আমদানি করা পণ্য পাকিস্তানের ভূখণ্ড দিয়ে সড়কপথে ইরানে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

 

পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, ইরানগামী পণ্যের জন্য মোট ছয়টি স্থল ট্রানজিট রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব রুট পাকিস্তানের করাচি, পোর্ট কাসিম ও গোয়াদার বন্দরকে বেলুচিস্তানের গাব্দ ও তাফতান সীমান্ত ক্রসিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করবে। অর্থাৎ সমুদ্রপথে ইরানি বন্দরে সরাসরি যাওয়া কঠিন হলেও পাকিস্তানি বন্দর হয়ে পণ্য সড়কপথে ইরানে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হলো।

 

কোন ছয় রুট দিয়ে পণ্য যাবে

ডনের প্রতিবেদনে উল্লেখিত ছয়টি রুট হলো-গোয়াদার-গাব্দ, করাচি/পোর্ট কাসিম-লিয়ারি-ওরমারা-পাসনি-গাব্দ, করাচি/পোর্ট কাসিম-খুজদার-দালবন্দিন-তাফতান, গোয়াদার-তুরবাত-হোশাব-পাঞ্জগুর-নাগ-বেসিমা-খুজদার-কোয়েটা/লাকপাস-দালবন্দিন-নোকুন্দি-তাফতান, গোয়াদার-লিয়ারি-খুজদার-কোয়েটা/লাকপাস-দালবন্দিন-নোকুন্দি-তাফতান এবং করাচি/পোর্ট কাসিম-গোয়াদার-গাব্দ রুট। এসব রুটের মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রধান বন্দরগুলো থেকে ইরান সীমান্তে পণ্য পরিবহন করা যাবে।

 

দ্য ন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থাটি কার্যত পাকিস্তানি বন্দর ও ইরান সীমান্তের মধ্যে একটি স্থল সেতু তৈরি করছে। বিশেষ করে করাচি, পোর্ট কাসিম ও গোয়াদার থেকে ইরান সীমান্তে পণ্য পাঠানোর পথ তৈরি হওয়ায় অবরোধের সময় তেহরানের জন্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প সুযোগ তৈরি হতে পারে।

 

কেন এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ

যুক্তরাষ্ট্র ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধ কার্যকর করেছে। এর ফলে ইরানি বন্দরে সরাসরি যাওয়া বা সেখান থেকে পণ্য বের করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ডনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানগামী ৩ হাজারের বেশি কনটেইনার কয়েক দিন ধরে করাচি বন্দরে আটকে ছিল। এই পরিস্থিতিতেই পাকিস্তান নতুন ট্রানজিট আদেশ জারি করে।

 

আরব নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তৃতীয় দেশ থেকে আসা পণ্য পাকিস্তানের স্থলপথ ব্যবহার করে ইরানে যেতে পারবে। এই ব্যবস্থা করাচি, পোর্ট কাসিম ও গোয়াদারকে বেলুচিস্তানের সীমান্তপথের সঙ্গে যুক্ত করবে। এতে আটকে থাকা কনটেইনার ছাড়ের পথ সহজ হতে পারে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ইরানের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সমুদ্রপথে চাপ থাকলে স্থলপথই পণ্য আমদানি, খাদ্য, শিল্প কাঁচামাল ও জরুরি সরবরাহের বিকল্প হতে পারে। তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধকে পুরোপুরি অকার্যকর করবে না; কারণ তেল রপ্তানি, বৃহৎ জাহাজভিত্তিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক আর্থিক লেনদেনের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এখনও বড় বাধা হিসেবে থাকবে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কি দুর্বল হবে?

এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান ছয়টি স্থল রুট খুলে দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘maximum pressure’ কৌশলে একটি ফাঁক তৈরি হতে পারে বলে কিছু মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মনে করছেন। যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের বন্দর, তেল রপ্তানি ও আর্থিক নেটওয়ার্কে চাপ বাড়াচ্ছে, তখন পাকিস্তানের এই ট্রানজিট সুবিধা তেহরানকে অন্তত কিছু পণ্য সরবরাহে বিকল্প পথ দেবে।

 

ইকোনমিক টাইমসও লিখেছে, পাকিস্তানের এই পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের অবরোধনীতিকে আইনগত ও বাস্তবিকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। কারণ পণ্য যদি পাকিস্তানি ভূখণ্ড দিয়ে ইরানে যায়, তাহলে সেটি সরাসরি ইরানি বন্দর অবরোধের আওতায় পড়ে কি না-এ নিয়ে নতুন কূটনৈতিক ও আইনি প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

 

তবে পাকিস্তান এখনো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান নিচ্ছে-এমন বলা কঠিন। ইসলামাবাদ একদিকে ইরানের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চাইছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কও নষ্ট করতে চায় না। তাই এই সিদ্ধান্তকে অনেক বিশ্লেষক পাকিস্তানের ‘balancing act’ বা কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

 

মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের অবস্থান আরও জটিল

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তান ইতোমধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সাম্প্রতিক লাইভ আপডেটে বলা হয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি যুদ্ধ শেষ ও অবরোধ প্রত্যাহারের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়। একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

 

এর আগে আরেক প্রতিবেদনে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানায়, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরোক্ষ আলোচনায় ভূমিকা রাখছে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন ইসলামাবাদে সরাসরি দূত পাঠানোর পরিকল্পনা স্থগিত করেছিল, তবুও পাকিস্তানি কর্মকর্তারা দাবি করেন, মধ্যস্থতার প্রক্রিয়া চলমান আছে।

 

এই অবস্থায় ইরানের জন্য স্থল বাণিজ্যপথ খুলে দেওয়া পাকিস্তানের নিরপেক্ষতার প্রশ্নকে আরও জটিল করতে পারে। ইরানের কাছে এটি বন্ধুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এটি অবরোধের চাপ কমানোর পথ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

 

আঞ্চলিক অর্থনীতির জন্য কী অর্থ বহন করে

যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে ইরান, পাকিস্তান, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য প্রবাহে চাপ তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত হওয়ায় পণ্য পরিবহন, বীমা ব্যয়, জ্বালানি সরবরাহ ও বন্দরের কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এমন সময়ে পাকিস্তানের স্থলপথ খুলে দেওয়া ইরানের পাশাপাশি পাকিস্তানের বন্দর অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

 

বিশেষ করে গোয়াদার বন্দরকে এই রুটে যুক্ত করা কৌশলগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। গোয়াদার চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর বা সিপিইসি–এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাকিস্তান যদি গোয়াদারকে ইরানগামী ট্রানজিট বাণিজ্যের একটি কার্যকর কেন্দ্র বানাতে পারে, তাহলে বন্দরটির ব্যবহার বাড়বে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যে পাকিস্তানের ভূমিকা শক্তিশালী হতে পারে।

 

তবে ঝুঁকিও কম নয়। যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরান নিষেধাজ্ঞা এড়াচ্ছে, তাহলে পাকিস্তানি ব্যাংক, শিপিং কোম্পানি বা ট্রানজিট সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর সেকেন্ডারি স্যাংশনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই ইসলামাবাদকে পণ্যের ধরন, উৎস, গন্তব্য, ব্যাংকিং লেনদেন এবং নিষেধাজ্ঞা-ঝুঁকি খুব সতর্কভাবে যাচাই করতে হবে।

 

ইরানের জন্য কতটা স্বস্তি

ইরানের জন্য এই পথ তাৎক্ষণিকভাবে খাদ্যপণ্য, শিল্প কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ এবং সাধারণ আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এটি তেল রপ্তানির সম্পূর্ণ বিকল্প নয়। ইরানের অর্থনীতির বড় অংশ তেল আয়ের ওপর নির্ভরশীল। সমুদ্রপথে তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত থাকলে স্থলপথ সেই ক্ষতি পুরোপুরি পূরণ করতে পারবে না।

 

তবুও রাজনৈতিকভাবে এর গুরুত্ব বড়। কারণ এটি দেখায়, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ থাকা সত্ত্বেও ইরান আঞ্চলিক অংশীদারদের মাধ্যমে বিকল্প বাণিজ্যপথ খুঁজছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানও দেখাতে চাইছে, আঞ্চলিক বাণিজ্য ও মানবিক সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করা তার স্বার্থে নয়।

 

ইরানের জন্য পাকিস্তানের স্থল বাণিজ্যপথ খুলে দেওয়া শুধু একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে ইরান অবরোধের চাপ কমাতে নতুন পথ পেল, অন্যদিকে পাকিস্তান তার ভৌগোলিক অবস্থানকে ব্যবহার করে আঞ্চলিক বাণিজ্যে নতুন ভূমিকা নিতে চাইছে।

 

তবে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব নির্ভর করবে পাকিস্তান কী ধরনের পণ্য, কোন আর্থিক ব্যবস্থায় এবং কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে ট্রানজিটের অনুমতি দেয় তার ওপর। যদি এটি শুধু মানবিক ও সাধারণ বাণিজ্যপণ্য পরিবহনে সীমিত থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক চাপ তুলনামূলক কম হতে পারে। কিন্তু যদি ইরানের নিষেধাজ্ঞাভুক্ত বাণিজ্য বা তেল-সম্পর্কিত লেনদেনে সহায়তা করে বলে সন্দেহ তৈরি হয়, তাহলে ইসলামাবাদ-ওয়াশিংটন সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন দেখা দিতে পারে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা


সম্পর্কিত নিউজ