ইরানি বন্দর অবরোধে মার্কিন নৌবাহিনী ‘জলদস্যুদের মতো’ কাজ করছে: ট্রাম্প

ইরানি বন্দর অবরোধে মার্কিন নৌবাহিনী ‘জলদস্যুদের মতো’ কাজ করছে: ট্রাম্প
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক মন্তব্যে। ফ্লোরিডায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ইরানি বন্দর অবরোধ কার্যকরে মার্কিন নৌবাহিনী “জলদস্যুদের মতো” কাজ করছে। সম্প্রতি মার্কিন বাহিনীর হাতে একটি জাহাজ জব্দের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ওই অভিযানে জাহাজ, পণ্য ও তেল যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, মার্কিন বাহিনী জাহাজটির ওপর অভিযান চালিয়ে সেটির নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং পণ্য ও তেল জব্দ করে। তিনি এটিকে “খুব লাভজনক ব্যবসা” বলেও মন্তব্য করেন। উপস্থিত জনতার হর্ষধ্বনির মধ্যে ট্রাম্প আরও বলেন, “আমরা অনেকটা জলদস্যুদের মতো, তবে আমরা কোনো খেলা খেলছি না।” তার এই মন্তব্য দ্রুত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের আইনগত ও নৈতিক প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের বন্দর থেকে বের হওয়া বা সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করা কয়েকটি নিষেধাজ্ঞাভুক্ত জাহাজ, বিশেষ করে তেলবাহী ট্যাংকার ও পণ্যবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটন বলছে, এসব অভিযান ইরানের তেল রপ্তানি ও যুদ্ধ অর্থায়নের সক্ষমতা সীমিত করার অংশ। তবে ট্রাম্প নিজেই যখন এই অভিযানকে “জলদস্যুদের মতো” বলে বর্ণনা করছেন, তখন সমালোচকেরা বলছেন, এতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও বিতর্কিত হয়ে উঠতে পারে।

 

হরমুজ ঘিরে পাল্টাপাল্টি অবরোধ

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থাকা কয়েকটি দেশে পাল্টা হামলা চালায়। যুদ্ধ শুরুর পর তেহরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিজেদের জাহাজ ছাড়া প্রায় সব ধরনের নৌযান চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করে। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আলাদা নৌ অবরোধ আরোপ করে।

 

হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত প্রভাব পড়ে। যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তেলের দামও বেড়েছে।

 

জাহাজ চলাচলে ‘ফি’ নিয়ে নতুন সতর্কতা

ট্রাম্পের মন্তব্য এমন সময়ে এল, যখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের সম্ভাব্য ফি বা টোল আদায়ের পরিকল্পনা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র সতর্কতা জারি করেছে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ শিপিং কোম্পানিগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, ইরানকে হরমুজ পারাপারের জন্য কোনো অর্থ, ডিজিটাল সম্পদ, পণ্য বিনিময় বা দাতব্য অনুদানের আকারে অর্থ দেওয়া হলে তা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি করবে।

 

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পক্ষ থেকে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা বা পারাপারের বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার ধারণা সামনে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের OFAC এই সতর্কতা দেয়। এমনকি ইরানের কোনো দাতব্য সংস্থায় অনুদানের নামেও অর্থ দেওয়া হলে তা নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় নেটওয়ার্ক, ফ্রন্ট কোম্পানি এবং একটি পানামা-পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

 

কেন ‘জলদস্যু’ মন্তব্য এত সংবেদনশীল

আন্তর্জাতিক আইনে জলদস্যুতা সাধারণত রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বাইরে বেসরকারি সশস্ত্র গোষ্ঠী বা অপরাধী চক্রের সমুদ্রপথে জাহাজ দখল, হামলা বা সম্পদ লুটের ঘটনাকে বোঝায়। রাষ্ট্রীয় নৌবাহিনী কোনো ঘোষিত সামরিক অবরোধের অংশ হিসেবে জাহাজ আটক করলে সেটি ভিন্ন আইনি কাঠামোর মধ্যে বিবেচিত হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিজেই যখন মার্কিন নৌ অভিযানের বর্ণনায় “pirates” শব্দ ব্যবহার করেন, তখন তা কূটনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর এবং আইনগতভাবে বিতর্কিত হয়ে ওঠে।

 

আরো পড়ুন : তেলের দামে ট্রাম্পের ওপর ক্ষোভে ফুঁসছে ক্যালিফোর্নিয়াবাসী

 

সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের ভাষা যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান দুর্বল করতে পারে। ওয়াশিংটন যেখানে ইরানকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, নিষেধাজ্ঞা এড়ানো এবং অবৈধ তেল বাণিজ্যের অভিযোগে অভিযুক্ত করছে, সেখানে মার্কিন অভিযানের বর্ণনায় “লাভজনক ব্যবসা” ও “জলদস্যু” শব্দ ব্যবহার তেহরানের প্রচারণাকে শক্তিশালী করতে পারে।

 

ইরানের পাল্টা অবস্থান

তেহরান শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধকে অবৈধ বলে দাবি করছে। ইরানের ভাষ্য, হরমুজ প্রণালিতে তাদের কড়াকড়ি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার প্রতিক্রিয়া। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য, ইরানের তেল রপ্তানি, সামরিক অর্থায়ন এবং নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর নেটওয়ার্ক বন্ধ করাই অবরোধের লক্ষ্য।

 

ইরান আরও বলছে, এই অবরোধের বাস্তব প্রভাব শুধু তেহরানের ওপর পড়ছে না; বরং তেলের দাম বাড়িয়ে তা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। হরমুজে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ঝুঁকি আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বাড়িয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও সমালোচনা

ইরান যুদ্ধ ও নৌ অবরোধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও সমালোচনা বাড়ছে। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ ইরানকে আলোচনায় ফিরতে বাধ্য করবে। তবে বিরোধী রাজনীতিক ও আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, যুদ্ধের লক্ষ্য অস্পষ্ট এবং কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই সামরিক চাপ দীর্ঘায়িত করা সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি করছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করার আগের হুমকিও ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে; কিছু বিশেষজ্ঞ এমন হুমকিকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

 

জ্বালানি বাজারে চাপ

হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা ও ইরানি বন্দর অবরোধের কারণে তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। জাহাজ চলাচল কমে গেলে তেলবাহী ট্যাংকারের রুট বদলাতে হয়, বীমা খরচ বাড়ে এবং সরবরাহ বিলম্বিত হয়। এতে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে গ্যাসোলিন, ডিজেল, জেট ফুয়েল, পরিবহন ব্যয় এবং নিত্যপণ্যের দামে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, অবরোধ দীর্ঘ হলে যুক্তরাষ্ট্রসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর সাধারণ মানুষও এর চাপ অনুভব করবে। অর্থাৎ ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।

 

ট্রাম্পের “জলদস্যুদের মতো” মন্তব্য ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নৌ অবরোধকে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। ওয়াশিংটন এই অভিযানকে ইরানের অর্থনীতি ও তেল রপ্তানির ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখছে। কিন্তু জাহাজ দখল, তেল জব্দ এবং সেটিকে “লাভজনক ব্যবসা” বলা আন্তর্জাতিক আইন, সামরিক নীতি এবং কূটনৈতিক ভাষার দিক থেকে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

 

হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পাল্টাপাল্টি অবস্থান অব্যাহত থাকলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। আর ট্রাম্পের এই মন্তব্য সেই উত্তেজনার রাজনৈতিক মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিল।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ