{{ news.section.title }}
ইরান-ট্রাম্প শান্তি আলোচনার সম্ভাবনায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে পতন
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত কমার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো কমেছে জ্বালানি তেলের দাম। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইতিবাচক ইঙ্গিতের পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে।
রয়টার্স জানিয়েছে, বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৭ দশমিক ৯৮ ডলারে নেমে আসে, যা আগের দিনের তুলনায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ কম। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০০ দশমিক ৪৪ ডলারে দাঁড়ায়। আপনার দেওয়া সময়ের আগের লেনদেনে ব্রেন্ট ১০৮ দশমিক ৩৫ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ১০০ দশমিক ৭৭ ডলারে ছিল; পরের আপডেটে দাম আরও কিছুটা কমে।
এর আগের দিনও তেলের বাজারে বড় দরপতন দেখা যায়। মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৪ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৯ দশমিক ৮৭ ডলারে এবং ডব্লিউটিআই ৩ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ১০২ দশমিক ২৭ ডলারে স্থির হয়। এর আগে সোমবার হরমুজ প্রণালিতে সংঘাত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ব্রেন্ট প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৪ দশমিক ৪৪ ডলারে পৌঁছেছিল।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দামের এই ওঠানামা সরবরাহের বাস্তব ঘাটতির পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির প্রতিফলন। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ সামরিক উত্তেজনা, নৌ অবরোধ বা জাহাজ চলাচলের সীমাবদ্ধতায় পড়লে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। কিন্তু এখন শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির আভাস পাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, সরবরাহ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা জাহাজ বের করে আনার সামরিক উদ্যোগ ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত চুক্তি করা যায় কি না, তা দেখার জন্য এই বিরতি নেওয়া হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বহাল থাকবে। রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্পের এই ঘোষণাই বাজারে শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
প্রজেক্ট ফ্রিডম শুরু হয়েছিল হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে আনার লক্ষ্যে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আগে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র আটকে পড়া জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপদে বের করতে সহায়তা করবে। তবে ইরান এই ধরনের সামরিক উদ্যোগকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের কাছাকাছি বলে সতর্ক করেছিল। এর পরই শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির কথা বলে ট্রাম্প অভিযান স্থগিতের সিদ্ধান্ত জানান।
তবে বাজারের স্বস্তি এখনো সীমিত। কারণ প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত হলেও ইরানি বন্দরের ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়নি। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বাজার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির আশায় ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই কমলেও অবরোধ বহাল থাকার কারণে দাম আরও দ্রুত নামার পথে বাধা রয়ে গেছে। অর্থাৎ বাজার আশাবাদী হলেও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নয়।
এদিকে তেলের বাজারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে যুক্তরাষ্ট্রের মজুত পরিস্থিতি। আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ মে শেষ হওয়া সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুত কমেছে ৮ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল। বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা ছিল মজুত কমবে ২ দশমিক ৮ মিলিয়ন ব্যারেল। একই সময়ে গ্যাসোলিন ও ডিস্টিলেট মজুতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এই তথ্য সাধারণত তেলের দামকে ঊর্ধ্বমুখী করার মতো হলেও, এবার শান্তি আলোচনার আশাবাদ বাজারে বড় প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, সামনে তেলের দামের গতিপথ নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য চুক্তি বাস্তবে এগোয় কি না। দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়। তৃতীয়ত, মার্কিন নৌ অবরোধ এবং ইরানের পাল্টা কড়াকড়ি কতদিন চলতে থাকে। যদি কূটনৈতিক অগ্রগতি স্থায়ী হয়, তাহলে দাম আরও কমতে পারে। কিন্তু নতুন সামরিক সংঘর্ষ বা জাহাজে হামলার খবর এলে বাজার আবার দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।
বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এই দরপতন আপাতত কিছুটা স্বস্তির খবর। তবে ব্রেন্ট এখনো ১০০ ডলারের অনেক ওপরে, যা আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ ধরে রাখবে। তাই কয়েক দিনের দরপতন সত্ত্বেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এখনো ঝুঁকিমুক্ত বলা যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, হরমুজ সংকট ঘিরে তেলের বাজার এখন কূটনৈতিক খবরের ওপর অত্যন্ত সংবেদনশীল। ট্রাম্পের প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিতের ঘোষণা বাজারে স্বস্তি দিয়েছে, কিন্তু ইরানি বন্দরের ওপর অবরোধ বহাল থাকায় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। শান্তি চুক্তির বাস্তব অগ্রগতি না হলে এই দরপতন সাময়িকও হতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স