যুদ্ধ বন্ধে এক পৃষ্ঠার সমঝোতার কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান, খুলছে হরমুজ প্রণালি

যুদ্ধ বন্ধে এক পৃষ্ঠার সমঝোতার কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান, খুলছে হরমুজ প্রণালি
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উপসাগরীয় যুদ্ধ বন্ধে দুই পক্ষ এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ চূড়ান্ত করার কাছাকাছি পৌঁছেছে। শান্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত পাকিস্তানের একটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, যুদ্ধ অবসানের বিষয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস একই ধরনের খবর প্রকাশ করেছিল। পাকিস্তানি সূত্রটি রয়টার্সকে জানায়, অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনটি সঠিক। সূত্রের ভাষায়, “আমরা খুব দ্রুতই এটি শেষ করব। আমরা কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।”

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউস মনে করছে তারা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের জন্য এক পৃষ্ঠার, ১৪ দফার একটি সমঝোতা কাঠামোর কাছাকাছি পৌঁছেছে। এই সমঝোতা শুধু যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা নয়; বরং পরবর্তী বিস্তারিত পারমাণবিক আলোচনার একটি রূপরেখা হিসেবেও কাজ করবে। রয়টার্সও অ্যাক্সিওসের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, প্রস্তাবিত সমঝোতার আওতায় যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করার পাশাপাশি ৩০ দিনের একটি আলোচনাকাল শুরু হতে পারে। ওই সময়ে হরমুজ প্রণালি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ সম্পদ ফেরতের মতো বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা।

 

সম্ভাব্য চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে-ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিতে সাময়িক স্থগিতাদেশ, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলার সম্পদ ফেরত দেওয়া এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিল করা। অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের কাছ থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জবাব আশা করছে। তবে রয়টার্স জানিয়েছে, এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও ইরানি কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করেননি।

 

এই অগ্রগতির খবর আসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার সামরিক উদ্যোগ ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত করার কয়েক ঘণ্টা পর। প্রজেক্ট ফ্রিডমের লক্ষ্য ছিল হরমুজে আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে আনা। তবে ইরান এ ধরনের মার্কিন সামরিক উদ্যোগকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের শামিল বলে সতর্ক করেছিল। এরপর ট্রাম্প ঘোষণা দেন, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের অনুরোধ এবং সম্ভাব্য চুক্তির অগ্রগতির কারণে অভিযানটি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হচ্ছে। তবে তিনি একই সঙ্গে জানান, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ বহাল থাকবে।

 

পাকিস্তানের ভূমিকা এই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইসলামাবাদ এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানই এখন পর্যন্ত সরাসরি শান্তি প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেল হিসেবে কাজ করেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান, ইরানের সঙ্গে সীমান্ত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ নিরাপত্তা সম্পর্ক-সব মিলিয়ে পাকিস্তান এই সংকটে একটি কার্যকর বার্তাবাহক হয়ে উঠেছে।

 

হরমুজ প্রণালি এই সমঝোতার কেন্দ্রে রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের বড় অংশ এই পথ দিয়ে যায়। ফলে হরমুজে অচলাবস্থা শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, পরিবহন ব্যয়, বীমা খরচ এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। সমঝোতার অংশ হিসেবে দুই পক্ষই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের বিধিনিষেধ ধাপে ধাপে তুলে নিতে পারে বলে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

তবে প্রস্তাবিত সমঝোতা এখনো চূড়ান্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইরান গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে জবাব দিলে অগ্রগতি আরও স্পষ্ট হবে। অন্যদিকে তেহরান বলেছে, তারা শুধু “ন্যায্য” ও “পূর্ণাঙ্গ” চুক্তি মেনে নেবে। ইরানের অবস্থান হলো-নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ, জব্দ সম্পদ, হরমুজ প্রণালি এবং পারমাণবিক অধিকার-সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। ফলে এক পৃষ্ঠার এমওইউ চূড়ান্ত হলেও পরবর্তী ৩০ দিনের বিস্তারিত আলোচনা কঠিন হতে পারে।

 

বাজারেও এই খবরের তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে। সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির খবরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। রয়টার্সের লাইভ আপডেটে বলা হয়েছে, হরমুজ সংকটের সমাধান হতে পারে-এমন আশায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে। তবে অবরোধ বহাল থাকা, ইরানের চূড়ান্ত জবাব না আসা এবং যুদ্ধবিরতির ভঙ্গুর অবস্থার কারণে বাজার এখনো সতর্ক।

 

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ বন্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মুহূর্তে পৌঁছেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারকটি যদি চূড়ান্ত হয়, তাহলে এটি যুদ্ধ বন্ধের আনুষ্ঠানিক পথ খুলতে পারে এবং পরবর্তী পারমাণবিক ও নিরাপত্তা আলোচনার ভিত্তি তৈরি করবে। তবে শেষ পর্যন্ত চুক্তি হবে কি না, তা নির্ভর করছে ইরানের ৪৮ ঘণ্টার সম্ভাব্য জবাব, মার্কিন অবরোধ নীতির ভবিষ্যৎ এবং হরমুজ প্রণালিতে বাস্তব নৌচলাচল পুনরুদ্ধারের ওপর।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ