{{ news.section.title }}
আবারও বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম
মধ্যপ্রাচ্যে আবারও যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কঠোর অবস্থান, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অনিশ্চয়তা এবং শান্তি আলোচনায় নতুন অচলাবস্থার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সরবরাহ সংকটের ভয় তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবেই সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি কয়েক ডলার বেড়ে যায়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের দেওয়া নতুন শান্তি প্রস্তাবকে “সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য” বলে প্রত্যাখ্যান করার পর বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৩ ডলার বেড়ে যায়। ইরানের প্রস্তাবে যুদ্ধ বন্ধ, ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, মার্কিন নৌ অবরোধ বন্ধ এবং ইরানি তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার মতো বিষয় ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সোমবার জুন ডেলিভারির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল বা ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলার ৪২ সেন্টে পৌঁছায়। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১১ হাজার ৬৪১ টাকা প্রতি ব্যারেল। একই সময়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দাঁড়ায় ১০৪ ডলার ৪৯ সেন্ট, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৭৪৮ টাকা প্রতি ব্যারেল।
এর আগে শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির খবরে তেলের দাম কিছুটা কমেছিল। কিন্তু ট্রাম্পের নতুন মন্তব্য সেই স্বস্তিকে দ্রুত ম্লান করে দিয়েছে। ব্যারন্স জানিয়েছে, ট্রাম্প ইরানের জবাবকে “totally unacceptable” বলার পর ব্রেন্ট ক্রুড ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে ১০৪ ডলারের ওপরে উঠে যায়, আর ডব্লিউটিআইও ঊর্ধ্বমুখী হয়। একই সঙ্গে মার্কিন শেয়ারবাজারের ফিউচার সূচকও কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে, যা দেখায় জ্বালানি বাজারের পাশাপাশি আর্থিক বাজারও নতুন অস্থিরতা নিয়ে সতর্ক।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও ইরান প্রসঙ্গে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এখনো শেষ হয়নি। তাঁর ভাষায়, তেহরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখনো বড় হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে। নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের পারমাণবিক উপাদান সরিয়ে নিতে হবে এবং সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করতে হবে। তাঁর এই বক্তব্যও বাজারে নতুন করে যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
তেলের বাজারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন হরমুজ প্রণালি। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। ইরান যদি এ পথের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করে বা যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ বড় ধাক্কায় পড়তে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের মন্তব্যের পর দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হলো বাজারের আশঙ্কা-হরমুজ প্রণালি হয়তো দ্রুত পুরোপুরি খুলবে না।
ইরান যুদ্ধের কারণে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তেলের বাজারে তীব্র ওঠানামা চলছে। কখনো শান্তি আলোচনার অগ্রগতির খবরে দাম কমছে, আবার আলোচনায় অচলাবস্থা বা সামরিক হুমকির খবরে দাম দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। রয়টার্সের ভারতবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অনিশ্চয়তার কারণে ব্রেন্ট ক্রুড গত এক মাসে ব্যারেলপ্রতি ৮৬ থেকে ১২৬ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করেছে। এই অস্থিরতা শুধু তেল উৎপাদক বা আমদানিকারক দেশ নয়, মুদ্রাবাজার, পরিবহন খরচ এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও প্রভাব ফেলছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাজার এখন কূটনৈতিক বার্তা ও সামরিক ঘটনার ওপর অত্যন্ত সংবেদনশীল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা হলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে, ফলে তেলের দাম কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু যদি আলোচনা ভেঙে যায়, অবরোধ চলতে থাকে বা ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র নতুন সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে দাম আরও বাড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য ঝুঁকি আরও বাড়ছে। তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ে ভোক্তা পর্যায়ে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো তাই আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের এই অস্থিরতার দিকে সতর্ক নজর রাখছে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি, তবে পরিস্থিতি আবারও ভঙ্গুর হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের ইরানি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, নেতানিয়াহুর কঠোর অবস্থান এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা বিশ্ব তেলের বাজারকে নতুন করে চাপে ফেলেছে। সামনে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হলে তেলের দাম আরও অস্থির হতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স