ইরানের আর কোনো সামরিক শক্তি অবশিষ্ট নেই : ট্রাম্প

ইরানের আর কোনো সামরিক শক্তি অবশিষ্ট নেই : ট্রাম্প
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ইরানের দেওয়া নতুন যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানান, তেহরান একটি চুক্তি করতে চাইছে, কিন্তু তাদের দেওয়া শর্ত এখনো ওয়াশিংটনের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান এখন চুক্তি করতে আগ্রহী, কারণ দেশটির সামরিক শক্তি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে কোন শর্তগুলো তার কাছে আপত্তিকর মনে হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।

ইরানের নতুন প্রস্তাবটি পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছানো হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তেহরান ইসলামাবাদের কাছে সর্বশেষ আলোচনার প্রস্তাব হস্তান্তর করে। পাকিস্তানি কর্মকর্তারাও পরে নিশ্চিত করেন, তারা সংশোধিত ইরানি প্রস্তাব মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি কর্মকর্তারা মনে করছেন, নতুন প্রস্তাব আলোচনার দরজা কিছুটা হলেও খুলে দিতে পারে।

 

প্রস্তাবে কী আছে

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনের বরাতে টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, নতুন প্রস্তাবে ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আলোচনা শুরু করতে রাজি হয়েছে। তবে এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কয়েকটি শর্ত। তেহরান চাইছে, যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ শিথিল করবে, আর ইরানের ওপর নতুন হামলা না চালানোর নিশ্চয়তা দেবে। আগের অবস্থানে ইরান হরমুজ আলোচনার আগে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি করেছিল, নতুন প্রস্তাবে সেই অবস্থান কিছুটা নরম করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

 

তবে সবচেয়ে বড় অচলাবস্থা রয়ে গেছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে। প্রস্তাবে ইরান চায়, হরমুজ প্রণালি ও যুদ্ধবিরতির বিষয়টি আগে সমাধান করা হোক, আর পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা কিছু সময়ের জন্য স্থগিত থাকুক। কিন্তু ওয়াশিংটন চাইছে, যুদ্ধবিরতি বা নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আলোচনা পারমাণবিক ইস্যু থেকে আলাদা করা যাবে না। নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের কাছ থেকে স্থায়ীভাবে পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা ত্যাগের নিশ্চয়তা চাইছে, যেখানে ইরানের প্রস্তাব তুলনামূলকভাবে সীমিত ও ধাপে ধাপে অগ্রগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

উইটকফের সংশোধনী ও যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনের বরাতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ গত ২৭ এপ্রিল ইরানের প্রস্তাবে কিছু সংশোধনী পাঠান। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল-আলোচনা চলাকালে ইরান যেন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে না নেয় এবং ওই স্থাপনাগুলোতে কোনো পারমাণবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু না করে।

 

এই শর্তগুলো থেকেই বোঝা যায়, ওয়াশিংটনের প্রধান উদ্বেগ এখনো ইরানের পারমাণবিক উপাদান, স্থাপনা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ঘিরে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, যুদ্ধবিরতি চললেও যদি ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম স্থানান্তর করে বা ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে কাজ শুরু করে, তাহলে ভবিষ্যতে পরমাণু আলোচনার ওপর ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

 

ট্রাম্পের বার্তা: ‘সঠিক চুক্তি’ দরকার

ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানকে “সঠিক চুক্তি” নিয়ে আসতে হবে। তার ভাষায়, “এই মুহূর্তে তারা যা প্রস্তাব করছে, তাতে আমি সন্তুষ্ট নই।” তিনি আরও বলেন, ইরানের নেতৃত্বের অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয় এবং তারা নিজেদের মধ্যে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারছে না। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে কূটনৈতিক পথ এখনো বন্ধ হয়নি, তবে তিনি সামরিক বিকল্পসহ সব পথ খোলা রাখছেন।

 

নিউইয়র্ক পোস্ট জানিয়েছে, ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে এবং দেশটি চাপের কারণেই আলোচনায় ফিরতে চাইছে। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, প্রস্তাবে এমন কিছু শর্ত আছে, যা মেনে নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।

 

হরমুজ প্রণালি কেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ইস্যু এখন হরমুজ প্রণালি। বিশ্ববাজারে তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে যায়। যুদ্ধ শুরুর পর প্রণালিটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে, জাহাজ চলাচল কমে যায়, বীমা খরচ বাড়ে, তেলের দাম বেড়ে যায় এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যচক্রে চাপ তৈরি হয়।

 

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগও হরমুজ নিয়ে নতুন সতর্কতা জারি করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন ট্রেজারি শিপিং কোম্পানিগুলোকে সতর্ক করেছে-ইরানকে হরমুজ প্রণালি পারাপারের নামে কোনো ধরনের অর্থ, টোল, ডিজিটাল সম্পদ, বার্টার পেমেন্ট বা তথাকথিত দাতব্য অনুদান দেওয়া হলে তা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি করবে। এই সতর্কবার্তা আসে এমন সময়ে, যখন ইরান যুদ্ধ অবসানের আলোচনার অংশ হিসেবে হরমুজে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে।

 

রয়টার্স আরও জানিয়েছে, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় নেটওয়ার্ক, ফ্রন্ট কোম্পানি এবং একটি পানামা-পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। অর্থাৎ আলোচনার দরজা খোলা থাকলেও ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক চাপ কমাচ্ছে না।

 

পাকিস্তানের মধ্যস্থতার গুরুত্ব

এই আলোচনায় পাকিস্তানের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে আলাদা আলাদা যোগাযোগ রেখেছে। চলমান যুদ্ধের মধ্যে সরাসরি সংলাপ কঠিন হয়ে পড়ায় পাকিস্তান একটি মধ্যবর্তী চ্যানেল হিসেবে কাজ করছে।

 

সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, পাকিস্তানি কর্মকর্তারা ইরানের নতুন প্রস্তাব মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন এবং তারা আগের তুলনায় আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখছেন। তবে প্রস্তাবের মূল বাধা রয়ে গেছে-যুক্তরাষ্ট্র চায় পারমাণবিক প্রশ্নে স্পষ্ট অঙ্গীকার, আর ইরান চায় আগে হামলা, অবরোধ ও হরমুজ সংকটের সমাধান।

 

যুদ্ধবিরতি থাকলেও অচলাবস্থা কাটছে না

এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস রয়ে গেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি ভঙ্গুর অবস্থায় টিকে আছে, কিন্তু কূটনৈতিক অগ্রগতি ধীর। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইরানের প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন।

 

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখতে হবে। ওয়াশিংটনের কৌশল এখন দুই দিক থেকে চলছে-একদিকে পাকিস্তানের মাধ্যমে আলোচনার পথ খোলা রাখা, অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা, হরমুজে আর্থিক নিয়ন্ত্রণ এবং পারমাণবিক স্থাপনার ওপর নজরদারি জোরদার করা।

 

বড় প্রশ্ন: চুক্তি, নাকি নতুন চাপ?

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের নতুন প্রস্তাব আগের তুলনায় কিছুটা নমনীয় হলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা পূরণ করছে না। তেহরান চাইছে যুদ্ধ থামুক, হরমুজ খুলুক এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল হোক। ওয়াশিংটন চাইছে, ইরান আগে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দৃশ্যমান ছাড় দিক। এই মৌলিক ব্যবধান না কমলে আলোচনায় দ্রুত অগ্রগতি কঠিন।

 

তবে দুই পক্ষই পুরোপুরি সংলাপ বন্ধ করেনি-এটাই আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইরান নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে, পাকিস্তান মধ্যস্থতা করছে, আর ট্রাম্পও বলেছেন, “দেখা যাক কী হয়।” কিন্তু একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, বর্তমান প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যথেষ্ট নয়।

 

ইরানের নতুন প্রস্তাব যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা তৈরি করলেও বড় অচলাবস্থা কাটায়নি। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ইঙ্গিত বাজার ও কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা স্থগিত রাখার শর্ত ওয়াশিংটনের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ট্রাম্পের অসন্তোষ তাই শুধু প্রস্তাবের ভাষা নিয়ে নয়, বরং যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্য নিরাপত্তা, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও।


সম্পর্কিত নিউজ