মার্কিন নৌ অবরোধ এড়িয়ে এশিয়া-প্যাসিফিকে ইরানি সুপারট্যাংকার, বহন করছে ২২ কোটি ডলারের তেল

মার্কিন নৌ অবরোধ এড়িয়ে এশিয়া-প্যাসিফিকে ইরানি সুপারট্যাংকার, বহন করছে ২২ কোটি ডলারের তেল
ছবির ক্যাপশান, ইরান তেল ট্যাঙ্কার |ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এড়িয়ে ইরানের একটি বিশাল তেলবাহী ট্যাংকার এশিয়া–প্যাসিফিক অঞ্চলের জলসীমায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ট্যাংকারট্র্যাকারস ডটকম। ন্যাশনাল ইরানিয়ান ট্যাংকার কোম্পানি বা এনআইটিসির মালিকানাধীন HUGE নামের ভিএলসিসি শ্রেণির এই সুপারট্যাংকারে ১৯ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমান বাজারমূল্যে এই তেলের দাম প্রায় ২২ কোটি ডলার।

আল জাজিরার লাইভ আপডেটে ট্যাংকারট্র্যাকারসের বরাতে বলা হয়েছে, HUGE গত ১৩ এপ্রিল ইরানি জলসীমায় ছিল-যেদিন মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের বন্দরগুলোতে যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর অবরোধ কার্যকর করার ঘোষণা দেয়। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটিকে এক সপ্তাহেরও বেশি আগে শ্রীলঙ্কা উপকূলের কাছে শনাক্ত করা হয়েছিল। বর্তমানে এটি ইন্দোনেশিয়ার লম্বক প্রণালি হয়ে রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জের দিকে যাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

 

এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ কতটা কার্যকর, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। ওয়াশিংটন দাবি করছে, অবরোধের মাধ্যমে ইরানের তেল রপ্তানি কার্যত চাপে পড়েছে। অন্যদিকে ইরান ও স্বাধীন জাহাজ-পর্যবেক্ষক সূত্রগুলো বলছে, তেহরান-সংশ্লিষ্ট কিছু জাহাজ এখনো নজরদারি এড়িয়ে বা বিকল্প পথ ব্যবহার করে চলাচল করছে।

 

এআইএস বন্ধ রেখে চলাচল

ট্যাংকারট্র্যাকারস জানিয়েছে, HUGE গত ২০ মার্চ মালাক্কা প্রণালি থেকে ইরানের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর থেকে তার Automatic Identification System বা AIS বন্ধ রেখেছিল। সাধারণত আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে AIS ব্যবহারের মাধ্যমে জাহাজের অবস্থান, গতি ও পরিচয় ট্র্যাক করা যায়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক ঝুঁকির সময় অনেক ট্যাংকার ইচ্ছাকৃতভাবে AIS বন্ধ করে দেয়, যাকে শিপিং বিশ্লেষকেরা ‘going dark’ বলে থাকেন।

 

এই কৌশল জাহাজটির অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন করে তোলে। ফলে মার্কিন নজরদারি ও অবরোধ থাকা সত্ত্বেও HUGE কীভাবে ইরানি জলসীমা থেকে বেরিয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হলো, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরান ইন্টারন্যাশনালও maritime monitoring reports-এর বরাতে জানিয়েছে, HUGE শনাক্তকরণ এড়িয়ে দূরপ্রাচ্যের জলসীমায় পৌঁছেছে।

 

মার্কিন অবরোধের প্রেক্ষাপট

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম ১২ এপ্রিল জানায়, ১৩ এপ্রিল সকাল ১০টা থেকে ইরানের সব বন্দরে প্রবেশ ও সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজের ওপর অবরোধ কার্যকর হবে। সেন্টকমের ঘোষণায় বলা হয়, অনুমোদন ছাড়া অবরুদ্ধ এলাকায় প্রবেশ বা বের হওয়ার চেষ্টা করলে জাহাজগুলো আটক, ঘুরিয়ে দেওয়া বা জব্দ করা হতে পারে।

 

এরপর মার্কিন বাহিনী বেশ কয়েকটি জাহাজ থামানো, তল্লাশি করা, ঘুরিয়ে দেওয়া বা ফেরত পাঠানোর দাবি করে। রয়টার্সের ২৩ এপ্রিলের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র তখন পর্যন্ত অন্তত তিনটি ইরান-সংশ্লিষ্ট তেলবাহী ট্যাংকার এশীয় জলসীমায় আটকে বা গতিপথ পরিবর্তনে বাধ্য করেছে। তখন মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছিলেন, অবরোধের অংশ হিসেবে ২৯টি জাহাজকে ঘুরিয়ে দেওয়া বা বন্দরে ফেরত যেতে বলা হয়েছে।

 

পরবর্তী সময়ে এই সংখ্যা আরও বাড়ে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন বাহিনী আরব সাগরে M/V Blue Star III নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ থামিয়ে তল্লাশি করে, তবে জাহাজটি ইরানের দিকে যাচ্ছিল না নিশ্চিত হওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই সময় সেন্টকম জানায়, অবরোধ শুরুর পর ৩৯টি জাহাজকে পুনর্নির্দেশ করা হয়েছে।

 

মেরিটাইম এক্সিকিউটিভের প্রতিবেদনে সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের বরাতে বলা হয়েছে, ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত অবরোধে ৪২টি, পরে ৪৪টি জাহাজ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে; এর মধ্যে ৪১টি ট্যাংকারে আনুমানিক ৬৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছিল, যার মূল্য ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

 

ইরানের দাবি: ৫২ জাহাজ অবরোধ ভেঙেছে

মার্কিন দাবির বিপরীতে ইরানের রাষ্ট্রীয় ও সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর নয়। ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অন্তত ৫২টি জাহাজ মার্কিন অবরোধ অতিক্রম করেছে। তবে এই দাবির স্বাধীন যাচাই পাওয়া কঠিন। সোশ্যাল মিডিয়া ও আঞ্চলিক সূত্রে এই দাবি ছড়ালেও যুক্তরাষ্ট্র তা অস্বীকার করে বলছে, অবরোধ কার্যকরভাবে চলছে।

 

HUGE সুপারট্যাংকারের ঘটনা এই বিতর্ককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ এটি শুধু একটি ছোট জাহাজ নয়; এটি প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহনে সক্ষম ভিএলসিসি ট্যাংকার। যদি এটি সত্যিই ইরান থেকে তেল নিয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে পৌঁছে থাকে, তাহলে তা ইরানের ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা নিষেধাজ্ঞা এড়ানো জাহাজ নেটওয়ার্কের সক্ষমতার বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হবে।

 

‘শ্যাডো ফ্লিট’ কীভাবে কাজ করে

ইরান দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে জটিল সামুদ্রিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে আসছে বলে পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ। এই নেটওয়ার্কে জাহাজের মালিকানা বদল, পতাকা পরিবর্তন, AIS বন্ধ রাখা, জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর, তৃতীয় দেশের বন্দরের ব্যবহার এবং তেলের উৎস গোপন করার মতো কৌশল ব্যবহারের অভিযোগ আছে।

 

আল জাজিরার অর্থনীতি-বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান-সংশ্লিষ্ট কিছু জাহাজ ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে, পরিচয় গোপন করে এবং বিকল্প রুট ব্যবহার করে মার্কিন নজরদারি এড়ানোর চেষ্টা করছে। এই কৌশলগুলো অবরোধ বাস্তবায়নকে জটিল করে তুলছে।

 

এশীয় বাজার কেন গুরুত্বপূর্ণ

ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা দীর্ঘদিন ধরে এশিয়া, বিশেষ করে চীনকেন্দ্রিক বাজার। ইন্দোনেশিয়ার রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জের দিকে HUGE-এর অগ্রসর হওয়ার তথ্য তাই গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলটি মালাক্কা প্রণালি ও দক্ষিণ চীন সাগর-সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের কাছে। আগে শিনহুয়ার এক প্রতিবেদনে ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজের বরাতে বলা হয়েছিল, একটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার দুই মিলিয়ন ব্যারেল তেল ইন্দোনেশিয়ার রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জে সরবরাহের পর হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।

 

যদিও এসব প্রতিবেদনের সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন, তবে এগুলো ইঙ্গিত দেয় যে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ইরানি তেলের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ সামুদ্রিক রুটে বড় চাপ তৈরি করলেও তেহরান বিকল্প গন্তব্য ও ট্র্যাকিং এড়ানোর কৌশল ব্যবহার করছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

 

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি: অবরোধে ইরানের বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি

মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, নৌ অবরোধ কার্যকর হচ্ছে এবং এতে ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি, ইরানের বন্দর অবরোধ ও ট্যাংকার আটকে দেওয়ার কারণে দেশটি তেল রপ্তানি করতে পারছে না। ফলে তেল ভাসমান মজুত বা স্থলভাগের স্টোরেজে জমা হচ্ছে। স্টোরেজ পূর্ণ হয়ে গেলে ইরানকে তেল উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ করতে হতে পারে-এমন দাবি করছে ওয়াশিংটন।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সম্প্রতি এই অবরোধকে অত্যন্ত কার্যকর বলে দাবি করেছেন। যদিও একই সঙ্গে তিনি মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ জব্দ অভিযানের বর্ণনায় “জলদস্যুর মতো” মন্তব্য করে বিতর্ক তৈরি করেন। রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প একটি জাহাজ জব্দের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র জাহাজ, পণ্য ও তেল নিয়েছে এবং এটি “লাভজনক ব্যবসা”।

 

আন্তর্জাতিক আইনি ও নিরাপত্তা প্রশ্ন

ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধকে অবৈধ এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক বলে অভিহিত করেছে। দ্য গার্ডিয়ানের লাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন বাহিনীর ইরান-সংশ্লিষ্ট ট্যাংকার জব্দকে “piracy and armed robbery” বা জলদস্যুতা ও সশস্ত্র ডাকাতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, অবরোধ ইরানের যুদ্ধ অর্থায়ন, নিষেধাজ্ঞা এড়ানো এবং তেল রপ্তানির অবৈধ নেটওয়ার্ক ভাঙার অংশ। কিন্তু অবরোধের আওতা যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই নিরপেক্ষ বাণিজ্যিক জাহাজ, আন্তর্জাতিক জলসীমা, বীমা খরচ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ঝুঁকি বাড়ছে।

 

জ্বালানি বাজারে প্রভাব

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা বিশ্ব তেলের বাজারে বড় চাপ তৈরি করেছে। হরমুজ রুট দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে সামরিক উত্তেজনা বা জাহাজ আটকানোর ঘটনা ঘটলেই বাজারে সরবরাহ ঝুঁকি বেড়ে যায়।

 

HUGE-এর মতো বড় ট্যাংকার যদি অবরোধ এড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছায়, তাহলে তা বাজারে দুই ধরনের বার্তা দেয়। একদিকে বোঝায়, ইরানি তেলের কিছু সরবরাহ এখনো বাজারে ঢুকছে। অন্যদিকে এটি মার্কিন অবরোধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, যা ওয়াশিংটনকে আরও কঠোর পদক্ষেপে যেতে প্ররোচিত করতে পারে। ফলে জাহাজ চলাচল, বীমা ও সামরিক ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

 

ইরানি সুপারট্যাংকার HUGE-এর এশিয়া-প্যাসিফিকে পৌঁছানোর খবর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। ওয়াশিংটন দাবি করছে, অবরোধ ইরানের তেল রপ্তানি ও অর্থনীতিকে গভীর চাপে ফেলেছে। কিন্তু ট্যাংকারট্র্যাকারসের তথ্য বলছে, অন্তত কিছু বড় ইরানি জাহাজ এখনো নজরদারি এড়িয়ে চলাচল করতে সক্ষম।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা


সম্পর্কিত নিউজ