{{ news.section.title }}
হরমুজে আটকে থাকা জাহাজ ছাড়াতে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ শুরু করছে যুক্তরাষ্ট্র, হুঁশিয়ারি ইরানের
হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা জাহাজগুলোকে বের করে আনতে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার তিনি জানান, সোমবার থেকে এই উদ্যোগ শুরু হবে। তার ভাষায়, ইরানের অবরোধে আটকে পড়া “নিরপেক্ষ ও নির্দোষ” দেশগুলোর অনুরোধেই ওয়াশিংটন এই পদক্ষেপ নিচ্ছে।
ট্রাম্প এই অভিযানের নাম দিয়েছেন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ইরান, মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেই আটকে থাকা জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে আনার কথা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে জানানো হয়েছে। তবে কোন কোন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহায়তা চেয়েছে, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।
ট্রাম্পের দাবি, অনেক জাহাজে খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বড় সংখ্যক ক্রু দীর্ঘ সময় জাহাজে আটকে থাকায় স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই কার্যক্রমে কোনো বাধা এলে তা “শক্তভাবে” মোকাবিলা করা হবে।তবে এই উদ্যোগ কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জাহাজ এসকর্ট করবে কি না, কিংবা তেহরানের সঙ্গে কোনো সমন্বয় হবে কি না-এসব বিষয়ে এখনো পরিষ্কার কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
যুদ্ধবিরতি ভাঙার ঝুঁকি
গত ৭ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ এবং ইরানি বন্দর ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়নি। এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের আপত্তি উপেক্ষা করে হরমুজে জাহাজ চলাচলে সরাসরি সহায়তা শুরু করে, তাহলে নাজুক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্পের ঘোষণার পর ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো “মার্কিন হস্তক্ষেপ” যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আজিজি বলেন, হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগর ট্রাম্পের “ভ্রমাত্মক পোস্ট” দিয়ে পরিচালিত হবে না। তার ভাষায়, দায় চাপানোর কৌশল কেউ বিশ্বাস করবে না।
সোমবার থেকে বাণিজ্যিক জাহাজে সহায়তা দেবে সেন্টকম
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানিয়েছে, সোমবার থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে চাওয়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সহায়তা দেওয়া শুরু হবে। সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এই প্রতিরক্ষামূলক মিশন জরুরি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধও বজায় রাখবে বলে জানান তিনি।
তবে কীভাবে জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে সেন্টকম বিস্তারিত কিছু জানায়নি। এর আগে মার্কিন সামরিক বাহিনী বলেছিল, সরু এই জলপথ দিয়ে জাহাজ এসকর্ট করার জন্য তারা তখনো প্রস্তুত নয়। কারণ, ওই পথে চলাচলের সময় ইরানি ভূখণ্ড থেকে হামলার ঝুঁকি থাকে।
তেলের বাজারে চাপ, যুক্তরাষ্ট্রেও ক্ষোভ
যুদ্ধবিরতি প্রায় এক মাস ধরে টিকে থাকলেও হরমুজে অচলাবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় চাপ তৈরি করেছে। ইরানের অবরোধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা নৌ অবরোধে তেলের দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের গড় দাম প্রতি গ্যালনে ৪ দশমিক ৪৪ ডলারে পৌঁছেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে এই দাম ছিল ৩ ডলারের নিচে। জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে এবং যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনগণের অসন্তোষও বাড়ছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার কথাও উঠে এসেছে।
এর আগে ট্রাম্প উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি অবরোধের বর্তমান অবস্থাকে মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এমনকি তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ “বোমা হামলার চেয়েও কার্যকর”। কিন্তু হরমুজে আটকে থাকা জাহাজ ছাড়াতে নতুন উদ্যোগ নিলে গত কয়েক সপ্তাহের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।
মানবিক উদ্যোগ, নাকি চাপ বাড়ানোর কৌশল?
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন এই উদ্যোগকে মানবিক সহায়তা হিসেবে দেখালেও তেহরান তা সেভাবে নাও দেখতে পারে। সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি আল জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি জাহাজ এসকর্ট করে, তাহলে মার্কিন বাহিনী ও সামরিক সরঞ্জাম ইরানের হামলার আওতার আরও কাছে চলে আসবে। তার মতে, এটি আসলেই কোনো মানবিক মিশন, নাকি আলোচনায় চাপ বাড়ানোর কৌশল-তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে তেহরান অনেক দিন ধরেই আশঙ্কা করছে, পরিস্থিতি কোনো না কোনোভাবে আবার উত্তেজনার দিকে যেতে পারে।
আলোচনার পথ এখনো খোলা বলছেন ট্রাম্প
তবে ট্রাম্প একই দিনে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেননি। ট্রুথ সোশ্যালে তিনি বলেন, তার প্রতিনিধিরা ইরানের সঙ্গে “খুব ইতিবাচক আলোচনা” করছেন এবং এসব আলোচনা সবার জন্য ভালো ফল আনতে পারে। তার দাবি, জাহাজ চলাচলের এই পদক্ষেপ শুধু সেই মানুষ, কোম্পানি ও দেশগুলোকে মুক্ত করতে নেওয়া হচ্ছে, যারা কোনো ভুল করেনি, বরং পরিস্থিতির শিকার হয়েছে।
ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন ট্রাম্প
এর কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প জানান, ইরানের দেওয়া সর্বশেষ ১৪ দফা যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব তিনি গ্রহণযোগ্য মনে করেন না। ইসরায়েলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কান-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রস্তাবটি তিনি পর্যালোচনা করেছেন, কিন্তু তা তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ১৪ দফা প্রস্তাবের বিস্তারিত এখনো পরিষ্কার নয়। তবে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তেহরান আগে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এরপর বৃহত্তর পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে চায় তারা।
ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক জবাব তারা পেয়েছেন এবং সেটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প এর আগেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে তিনি ইরানের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে চান। শনিবার তিনি লিখেছিলেন, ইরানের পাঠানো পরিকল্পনা তিনি পর্যালোচনা করবেন, তবে তার ধারণা সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ, তার ভাষায়, গত ৪৭ বছরে ইরান মানবতা ও বিশ্বের জন্য যা করেছে, তার জন্য দেশটি এখনো যথেষ্ট মূল্য দেয়নি।
অন্যদিকে ইরানও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তেহরান বলছে, যেকোনো হামলার বিরুদ্ধে তারা নিজেদের রক্ষা করবে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের যেকোনো “দুঃসাহসিকতা বা বোকামি” মোকাবিলায় তারা পুরোপুরি প্রস্তুত।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ ছাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যোগ যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎকে নতুন অনিশ্চয়তায় ফেলতে পারে। একদিকে ট্রাম্প মানবিক কারণ দেখাচ্ছেন, অন্যদিকে ইরান এটিকে সরাসরি মার্কিন হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। ফলে হরমুজের জলপথ এখন শুধু বাণিজ্য বা জ্বালানি সরবরাহের প্রশ্ন নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের পরবর্তী বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা