{{ news.section.title }}
গাজায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছে ৮ হাজার ফিলিস্তিনির লাশ
দুই বছরের ভয়াবহ যুদ্ধের পর গাজা এখন শুধু ধ্বংসস্তূপের জনপদ নয়, হাজারো নিখোঁজ মানুষের অস্থায়ী কবরস্থানে পরিণত হয়েছে। গাজার ধসে পড়া ভবন, রাস্তা, হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকার নিচে এখনও প্রায় ৮ হাজার ফিলিস্তিনির মরদেহ আটকে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপির এক কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, গাজার বিপুল ধ্বংসাবশেষের এক শতাংশেরও কম এখন পর্যন্ত পরিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। এই গতি অব্যাহত থাকলে পুরো ধ্বংসস্তূপ সরাতে অন্তত সাত বছর সময় লাগতে পারে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির হিসাব অনুযায়ী, গাজায় যুদ্ধের পর প্রায় ৬১ মিলিয়ন টন ধ্বংসাবশেষ তৈরি হয়েছে। এটি শুধু ইট-পাথর বা কংক্রিটের স্তূপ নয়; এর ভেতরে রয়েছে অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ, বিপজ্জনক ধাতব অংশ, ভবনের ধ্বংসাবশেষ, ঘরবাড়ির আসবাব, ব্যক্তিগত সম্পদ এবং বহু মানুষের দেহাবশেষ। ইউএনডিপি বলছে, ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু হলেও জ্বালানি সংকট, ভারী যন্ত্রপাতির অভাব, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধতার কারণে কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
গাজার ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভারী যন্ত্রপাতির ঘাটতির কারণে উদ্ধারকাজ প্রায় অচল অবস্থায় রয়েছে। অনেক পরিবার জানে, তাদের স্বজনেরা ধসে পড়া ভবনের নিচেই আছেন, কিন্তু খননযন্ত্র না থাকায় কিংবা জায়গাগুলো নিরাপদ না হওয়ায় তারা মরদেহ উদ্ধার করতে পারছে না। ফলে শত শত পরিবার শেষবারের মতো স্বজনের দেহ উদ্ধার করে দাফন করার অপেক্ষায় দিন গুনছে।
মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মরদেহ শুধু শোকের বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও মানবিক মর্যাদার বড় সংকট। দীর্ঘ সময় ধরে মরদেহ উদ্ধার না হলে পরিবারগুলো আইনগত, সামাজিক ও ধর্মীয় দিক থেকেও জটিলতায় পড়ে। অনেকের মৃত্যু নথিভুক্ত হয় না, উত্তরাধিকার, পরিবার পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়াও আটকে যায়।
যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই হওয়ার পরও গাজায় মৃত্যু থামেনি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৮২৮ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২ হাজার ৩৪২ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে ৭৬৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মোট হিসাবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজার ৬০৮ জনে পৌঁছেছে এবং আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭২ হাজার ৪৪৫ জনের বেশি।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে গাজার পুনর্গঠন হবে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন পুনর্গঠন কার্যক্রমগুলোর একটি। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গাজা পুনর্গঠনে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার বা ৭ হাজার কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। ইউএনডিপি জানিয়েছে, গাজার ঘরবাড়ি, সড়ক, হাসপাতাল, পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, স্কুল, সরকারি স্থাপনা এবং জনসেবামূলক অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রসমর্থিত বড় পুনর্গঠন পরিকল্পনা স্থবির হয়ে থাকায় গাজার মানুষ নিজেরাই ধ্বংসাবশেষ ব্যবহার করে রাস্তা মেরামতের চেষ্টা করছেন। ইউএনডিপির একটি প্রকল্পের আওতায় কংক্রিট ও ধাতব ধ্বংসাবশেষ চূর্ণ করে তা দিয়ে রাস্তা, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ও জরুরি প্রবেশপথ তৈরি করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৮৭ হাজার টন ধ্বংসাবশেষ সরানো হয়েছে, যা মোট ধ্বংসস্তূপের তুলনায় খুবই সামান্য।
ইউএনডিপি এর আগে জানিয়েছিল, সঠিক পরিবেশ, নিরাপত্তা, তহবিল, ভারী যন্ত্রপাতি ও প্রবেশাধিকার থাকলে সাত বছরের মধ্যে গাজার অধিকাংশ ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করা সম্ভব হতে পারে। তবে প্রাথমিক জাতিসংঘ মূল্যায়নে একসময় বলা হয়েছিল, পূর্ণাঙ্গ ধ্বংসাবশেষ সরাতে ১৪ থেকে ২০ বছরও লাগতে পারে। অর্থাৎ সময়সীমা নির্ভর করছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সীমান্তপথ খোলা, যন্ত্রপাতি প্রবেশ, জ্বালানি এবং নিরাপত্তার ওপর।
গাজার পুনর্গঠনের আরেক বড় বাধা হলো অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ। ধ্বংসস্তূপে বিপুল পরিমাণ গোলা, বোমা, ক্ষেপণাস্ত্রের অংশ ও বিস্ফোরক বস্তু রয়ে গেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এগুলো উদ্ধারকর্মী, শিশু, বাস্তুচ্যুত পরিবার এবং পুনর্গঠনকর্মীদের জন্য প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করছে। জাতিসংঘের মাইন অ্যাকশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধ্বংসস্তূপ সরানোর আগে অনেক এলাকায় বিস্ফোরক ঝুঁকি পরীক্ষা করতে হবে।
গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে। অনেক হাসপাতাল আংশিক বা পুরোপুরি অকার্যকর, স্কুলগুলো আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং বহু সড়ক চলাচলের অনুপযোগী। ফলে ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার না হলে শুধু পুনর্গঠন নয়, জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ছে।
সব মিলিয়ে গাজার সামনে এখন দুই ধরনের যুদ্ধ-একটি বেঁচে থাকার, আরেকটি ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবন ফিরিয়ে আনার। যুদ্ধ থামলেও হাজারো পরিবার এখনো স্বজনের মরদেহের অপেক্ষায়। আর যারা বেঁচে আছেন, তাদের সামনে আছে ভাঙা ঘর, অচল হাসপাতাল, ধ্বংস সড়ক, দূষিত পানি এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স