যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে বাড়ল তেলের দাম

যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে বাড়ল তেলের দাম
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অচলাবস্থা নতুন করে সহিংসতায় রূপ নেওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও বড় উল্লম্ফন দেখেছে। সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অন্যতম মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৪ দশমিক ৪৪ ডলারে পৌঁছে যায়। পরদিন মঙ্গলবার দাম কিছুটা কমলেও তা ১১৩ ডলারের ওপরে অবস্থান করছিল। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে সরবরাহ ঝুঁকি তেলের বাজারকে নতুন করে অস্থির করে তুলেছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবারের বড় উত্থানের পর মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুড ০ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১১৩ দশমিক ৫১ ডলারে লেনদেন করছিল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও কমলেও তা উচ্চ পর্যায়ে ছিল। তেলের বাজারে এই অস্থিরতার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলা এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে নিরাপত্তা শঙ্কাকে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

 

যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন সংশয়

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি এমনিতেই ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে নতুন সংঘর্ষ সেই যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই উপসাগরীয় জলসীমায় হামলা-পাল্টা হামলায় জড়ায়। এতে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বাজারে নতুন আতঙ্ক তৈরি হয়।

 

যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি উদ্যোগের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে বের করে আনার চেষ্টা করছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মায়ের্স্ক জানিয়েছে-একটি মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজ সামরিক সহায়তায় উপসাগর থেকে বের হয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ ধরনের সীমিত সাফল্য হরমুজে বাণিজ্যিক চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।

 

সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলা উত্তেজনা বাড়িয়েছে

সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাও বাজারে বড় প্রভাব ফেলেছে। রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানি হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। ওই হামলায় হরমুজ প্রণালির কয়েকটি জাহাজ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি তেলবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গালফ নিউজ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে একটি ADNOC তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানি ড্রোন হামলার অভিযোগ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলাকে বাণিজ্যিক নৌচলাচল ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছে।

 

কেন হরমুজ এত গুরুত্বপূর্ণ

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি। বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাই এই পথে সামরিক সংঘর্ষ, জাহাজে হামলা, নৌ অবরোধ বা বীমা ঝুঁকি বাড়লেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বাজার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কাই সোমবার তেলের দামকে দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী করেছে। প্রতিবেদনে ব্রেন্ট ক্রুডের ৫ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি এবং ডব্লিউটিআই ক্রুডের ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

 

বাজার এখন ভূরাজনীতির ওপর নির্ভরশীল

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান তেলের মূল্যবৃদ্ধি শুধু সরবরাহের বাস্তব ঘাটতির কারণে নয়; বরং ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা ও যুদ্ধবিরতির অনিশ্চয়তার কারণে। অর্থাৎ বাজার এখন মৌলিক চাহিদা-সরবরাহের হিসাবের চেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে সামরিক ঘটনা, কূটনৈতিক বার্তা এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর।

রয়টার্স বলছে, সাম্প্রতিক ওঠানামা বাজারে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির সরাসরি প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্র সীমিতভাবে জাহাজ বের করে আনতে পারলেও বাণিজ্যিক তেলপ্রবাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ইরানের পাল্টা হামলা এবং উপসাগরীয় তেল স্থাপনায় আঘাতের ঝুঁকি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে রেখেছে।

 

দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা

কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করছেন, হরমুজ প্রণালির সংকট দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম আরও অনেক ওপরে উঠতে পারে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েকটি বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষকেরা ২০২৬ সালের জন্য ব্রেন্টের পূর্বাভাস বাড়িয়েছেন। দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা বা সরবরাহে বড় বিঘ্ন হলে দাম আরও তীব্রভাবে বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

তেলের দাম এমন উচ্চ পর্যায়ে থাকলে শুধু জ্বালানি খাত নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও চাপ বাড়বে। পরিবহন ব্যয়, বিমান ভাড়া, খাদ্যপণ্য, শিল্প উৎপাদন ও আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে এর প্রভাব দ্রুত পড়তে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ