ইরানকে ‘সাদা পতাকা’ ওড়ানোর আহ্বান ট্রাম্পের

ইরানকে ‘সাদা পতাকা’ ওড়ানোর আহ্বান ট্রাম্পের
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে তুচ্ছজ্ঞান করে দেশটিকে আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ইরানের উচিত “আত্মসমর্পণের সাদা পতাকা” ওড়ানো। তবে আত্মসম্মান বা মর্যাদার কারণে তেহরান সেটি করছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সামরিক শক্তি এখন মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার ভাষায়, ইরান এখন শুধু “peashooters” বা ছোট খেলনা বন্দুকের মতো অস্ত্র দিয়ে গুলি চালানোর অবস্থায় আছে। তিনি বলেন, তেহরান প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান দেখালেও বাস্তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়। ট্রাম্পের দাবি, “যখন কারও সামরিক শক্তি শেষ হয়ে যায়, তখন চুক্তি করতে চাইবে না-এমনটা হয় না।”

 

আলোচনার আড়ালে চাপের ভাষা

ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত থামাতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একাধিক প্রস্তাব আদান-প্রদান হচ্ছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ৯ দফা প্রস্তাবের পাল্টা হিসেবে ১৪ দফা শান্তি পরিকল্পনা দিয়েছে। তেহরান দুই মাসের যুদ্ধবিরতির বদলে ৩০ দিনের মধ্যে স্থায়ী সমাধান চায় এবং হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ ও আঞ্চলিক যুদ্ধক্ষেত্রের বিষয়গুলো আগে সমাধানের দাবি জানিয়েছে।

 

এর আগে ট্রাম্প ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। আল জাজিরার আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি বলেছেন-ইরানের প্রস্তাবে এমন কিছু শর্ত আছে, যা তার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। ট্রাম্প আলোচনার পথ খোলা রাখলেও সামরিক বিকল্পের ভাষা বারবার ব্যবহার করেছেন।

 

নৌ অবরোধে সন্তুষ্ট ট্রাম্প

ওভাল অফিসের বক্তব্যে ট্রাম্প ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধেরও প্রশংসা করেন। তিনি অবরোধকে “ইস্পাতের খণ্ডের মতো” মজবুত বলে উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন, কেউ এই অবরোধ ভাঙার সাহস দেখাবে না। তার ভাষায়, অবরোধ “খুব ভালোভাবে কাজ করছে”।

 

যুক্তরাষ্ট্র গত ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানের বন্দরগুলোতে যাওয়া-আসা করা জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এই অবরোধের মাধ্যমে ইরানের তেল রপ্তানি ও যুদ্ধ অর্থায়নের পথ সংকুচিত করা হচ্ছে। তবে ইরান এই পদক্ষেপকে অবৈধ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক বলে আখ্যা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি ও ইরানি বন্দর ঘিরে এই অচলাবস্থার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা বেড়েছে।

 

যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের প্রশ্নে অস্পষ্ট জবাব

সাংবাদিকেরা ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন-ইরান কী করলে সেটিকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হবে। সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, “সময় হলে আপনারা জানতে পারবেন, কারণ আমিই আপনাদের জানাব।” তিনি আরও বলেন, ইরান ভালো করেই জানে তাদের কী করা উচিত নয়।

 

এই অস্পষ্ট বক্তব্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যুদ্ধবিরতি বজায় থাকার কথা বলছে, অন্যদিকে ইরানের বন্দর অবরোধ, হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উপস্থিতি এবং জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে। ফলে বাস্তবে যুদ্ধবিরতির সীমা কোথায় শেষ এবং সামরিক সংঘাত কোথায় শুরু-তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

 

‘Project Freedom’ সাময়িক স্থগিত

ট্রাম্পের কঠোর ভাষার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা জাহাজ বের করে আনার সামরিক উদ্যোগ Project Freedom সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বলে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করার আশা করছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ বহাল থাকবে।

 

চ্যানেল নিউজ এশিয়ার প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, Project Freedom স্থগিত হলেও ইরানি বন্দর অবরোধ অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ ওয়াশিংটন আলোচনার সুযোগ রাখতে চাইছে, কিন্তু অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ কমাচ্ছে না।

 

তেলের দাম ও জনমত নিয়েও চাপ

আল জাজিরার ভিডিও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প একই বক্তব্যে উচ্চ তেলের দামকে “ছোট মূল্য” হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যদি তার বিনিময়ে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকানো যায়। এই মন্তব্যও বিতর্ক তৈরি করেছে, কারণ ইরান সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম বেড়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ পড়ছে।

 

ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ সংকট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও চাপ বাড়ছে। জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি, নৌ অবরোধের আইনি ভিত্তি, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই সামরিক অভিযান দীর্ঘায়িত করা এবং যুদ্ধবিরতির অস্পষ্টতা-সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।

 

ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া

ট্রাম্পের “সাদা পতাকা” মন্তব্য তেহরানকে আরও ক্ষুব্ধ করতে পারে। ইরান আগেই বলেছে, আলোচনার নামে যুক্তরাষ্ট্র তাদের আত্মসমর্পণ করাতে চাইছে। তেহরানের অবস্থান হলো-হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ এবং জব্দ সম্পদের প্রশ্ন আগে সমাধান না হলে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বড় আলোচনায় যাওয়া সম্ভব নয়।

ইরানের সামরিক কর্মকর্তারাও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে ট্রাম্পের এই বক্তব্য আলোচনার পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।


সম্পর্কিত নিউজ