ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথে ট্রাম্প, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত

ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথে ট্রাম্প, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে-এমন দাবি করে হরমুজ প্রণালিতে চলমান মার্কিন সামরিক অভিযান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে তিনি জানান, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের অনুরোধ এবং ইরানের সঙ্গে “চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ চুক্তি” এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে এই অভিযান আপাতত বন্ধ রাখা হচ্ছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ বহাল থাকবে।

সিবিএস নিউজের লাইভ আপডেটে বলা হয়েছে, ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে “Great Progress” বা বড় অগ্রগতি হয়েছে। তাই একটি চুক্তি চূড়ান্ত ও স্বাক্ষর করা যায় কি না, তা দেখার জন্য প্রজেক্ট ফ্রিডম “স্বল্প সময়ের জন্য” স্থগিত করা হচ্ছে। তবে এই স্থগিতাদেশের মধ্যেও ইরানি বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর থাকবে বলে জানান তিনি।

 

কী ছিল প্রজেক্ট ফ্রিডম

প্রজেক্ট ফ্রিডম ছিল হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে আনার একটি মার্কিন সামরিক সহায়তা উদ্যোগ। সোমবার থেকে অভিযানটি শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড-সেন্টকম জানায়, এই মিশনের লক্ষ্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করা। আল জাজিরা জানায়, অভিযান শুরু হওয়ার সময় সেন্টকম বলেছিল, প্রজেক্ট ফ্রিডম “just begun” বা সদ্য শুরু হয়েছে।

 

রয়টার্স ও অস্ট্রেলিয়ার এবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অভিযানে ১৫ হাজার মার্কিন সামরিক সদস্য, ১০০টির বেশি বিমান, ড্রোন ও যুদ্ধজাহাজ সংশ্লিষ্ট ছিল বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। তবে অভিযান শুরুর এক দিনের মধ্যেই ট্রাম্প সেটি স্থগিত করেন।

 

পাকিস্তানের মধ্যস্থতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে

ট্রাম্পের ঘোষণায় পাকিস্তানের নাম সরাসরি উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন, পাকিস্তান ও আরও কয়েকটি দেশের অনুরোধে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত থামাতে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে বলে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল। ইরানের ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাবও পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছেছে বলে তেহরান-ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদের ভূমিকা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একদিকে পাকিস্তানের ইরানের সঙ্গে স্থলসীমান্ত, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সম্পর্ক আছে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও তার দীর্ঘ সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই হরমুজ সংকট কমাতে পাকিস্তানকে দুই পক্ষের মধ্যে একটি কার্যকর বার্তাবাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

 

ইরানের আপত্তি ও যুদ্ধবিরতি সংকট

প্রজেক্ট ফ্রিডম শুরুর আগেই ইরান এই অভিযানের বিরোধিতা করেছিল। তেহরান বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্র যদি হরমুজ প্রণালিতে সামরিকভাবে প্রবেশ করে বা আটকে থাকা জাহাজ সরানোর নামে অভিযান চালায়, তাহলে সেটি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের শামিল হবে। ইরানের সামরিক নেতৃত্বও সতর্ক করে বলেছিল, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং বিদেশি সামরিক শক্তি প্রবেশ করলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে। এই অবস্থায় ট্রাম্পের স্থগিতাদেশকে কেউ কেউ উত্তেজনা কমানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন। তবে অবরোধ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দেখাচ্ছে, ওয়াশিংটন কূটনীতির সুযোগ দিলেও ইরানের ওপর চাপ কমাতে প্রস্তুত নয়।

 

নৌ অবরোধ বহাল থাকবে

ট্রাম্পের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত হলেও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ চলবে। যুক্তরাষ্ট্র গত ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানি বন্দরে যাওয়া-আসা করা জাহাজের ওপর অবরোধ আরোপ করে। ওয়াশিংটনের দাবি, এই অবরোধ ইরানের তেল রপ্তানি ও যুদ্ধ অর্থায়নের পথ সংকুচিত করছে।

 

ইরান এই অবরোধকে অবৈধ, আগ্রাসী এবং আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা হরমুজ দিয়ে সাধারণ বাণিজ্যিক চলাচল পুনরুদ্ধার করতে চায়, কিন্তু ইরানের যুদ্ধ অর্থায়ন ও নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর পথ বন্ধ রাখবে।

 

জাহাজ চলাচল এখনো ঝুঁকিপূর্ণ

প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত হলেও হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ প্রণালি পার হতে শুরু করলেও শত শত জাহাজ এখনো আটকে আছে বা উচ্চ ঝুঁকির কারণে অপেক্ষা করছে। শিপিং কোম্পানিগুলোর অনেকেই এখনও রুট পরিবর্তন, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামরিক ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

 

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। তাই এখানে সামরিক অভিযান, অবরোধ বা জাহাজ চলাচলে অচলাবস্থা বিশ্ববাজারে দ্রুত প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে এবং অনেক দেশে জ্বালানি ব্যয় নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

 

আলোচনার সুযোগ, নাকি চাপের নতুন কৌশল

ট্রাম্প বলছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তির দিকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে চুক্তির খসড়া বা আলোচনার মূল শর্ত নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। আল জাজিরা জানিয়েছে, ট্রাম্পের ভাষায় প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত করা হয়েছে, যাতে দেখা যায় ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি “finalised and signed” করা যায় কি না।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, অবরোধ বজায় রেখে সামরিক অভিযান স্থগিত করা আসলে দ্বিমুখী কৌশল। এতে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতির দরজা খোলা রাখছে, অন্যদিকে ইরানের অর্থনীতি ও বন্দরভিত্তিক বাণিজ্যের ওপর চাপ অব্যাহত রাখছে।


সম্পর্কিত নিউজ