{{ news.section.title }}
মূর্তির মুখে সিগারেট গুঁজে আলোচনায় ইসরায়েলি সেনা
দক্ষিণ লেবাননের খ্রিষ্টান অধ্যুষিত দবেল গ্রামে কুমারী মেরির মূর্তির মুখে সিগারেট গুঁজে দেওয়ার ঘটনায় নতুন করে বিতর্কের মুখে পড়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়। পরে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ জানায়, ঘটনাটি তাদের নজরে এসেছে এবং অভিযুক্ত সেনার বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইডিএফের প্রাথমিক তদন্তে ছবিটি দক্ষিণ লেবাননের দবেল গ্রামে কয়েক সপ্তাহ আগে তোলা বলে জানা গেছে। যদিও ছবিটি বুধবার অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। আইডিএফ বলেছে, ঘটনাটি তদন্ত করা হবে এবং তদন্তের ফল অনুযায়ী ওই সেনার বিরুদ্ধে কমান্ড পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনাটি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে, কারণ একই দবেল গ্রামেই গত মাসে আরেক ইসরায়েলি সেনার ধর্মীয় অবমাননামূলক আচরণের ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই ঘটনায় এক সেনাকে যিশুর মূর্তি বা ক্রুশবিদ্ধ যিশুর ভাস্কর্য ভাঙতে দেখা যায়। রয়টার্স জানিয়েছে, তদন্তের পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সংশ্লিষ্ট দুই সেনাকে যুদ্ধদায়িত্ব থেকে সরিয়ে ৩০ দিনের সামরিক আটকাদেশ দেয়। একজন সেনা মূর্তিটি ক্ষতিগ্রস্ত করেছিলেন, আরেকজন ঘটনাটি ধারণ করেছিলেন।
আইডিএফ সে সময় জানিয়েছিল, সেনাদের আচরণ সামরিক নির্দেশনা ও বাহিনীর মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। ইসরায়েলি সেনাপ্রধান ইয়াল জামির ঘটনাটিকে “নৈতিক ব্যর্থতা” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনাস্থল হিসেবে দবেল গ্রামটি যাচাই করা হয়েছিল এবং সেনাবাহিনী স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিলে ক্ষতিগ্রস্ত ধর্মীয় প্রতীক প্রতিস্থাপনে কাজ করার কথা জানায়।
দবেল দক্ষিণ লেবাননের একটি খ্রিষ্টান গ্রাম। ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাতের মধ্যে দক্ষিণ লেবাননের বহু এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে দবেলের এক বাসিন্দা হুসাম নাদ্দাফ বলেন, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে তিনি নিজের পরিবারের ব্যক্তিগত বাগানের ক্রুশবিদ্ধ যিশুর ভাস্কর্য চিনতে পেরেছিলেন। তিনি জানান, চলাচলে ইসরায়েলি বাহিনীর বিধিনিষেধ থাকায় তিনি সরাসরি বাড়িতে গিয়ে ক্ষয়ক্ষতি দেখতে পারেননি।
এই ধরনের ঘটনা স্থানীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করেছে। লেবাননের ক্যাথলিক নেতৃত্বের একটি সংগঠন আগের যিশু মূর্তি ভাঙার ঘটনায় কঠোর নিন্দা জানিয়ে তাৎক্ষণিক ও বিশ্বাসযোগ্য জবাবদিহির দাবি করেছিল। আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, সংগঠনটি ঘটনাটিকে পবিত্রতার প্রতি মৌলিক শ্রদ্ধা ও মানবিক মর্যাদার গুরুতর ব্যর্থতা হিসেবে বর্ণনা করে।
জাতিসংঘও আগের যিশু মূর্তি ধ্বংসের ঘটনাকে “শকিং” বা হতবাক করার মতো বলে মন্তব্য করেছিল। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টেফান দুজারিক জানান, দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা যাওয়াটা কিছুটা আশ্বস্ত করার মতো, তবে ধর্মীয় প্রতীকের প্রতি এমন আচরণ গভীর উদ্বেগজনক।
আইডিএফ নতুন ঘটনাটির বিষয়ে বলেছে, তারা সব ধর্মের পবিত্র স্থান ও প্রতীকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ধর্মীয় স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করা তাদের নীতি নয়। তবে একই গ্রামে অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক অবমাননামূলক ঘটনার ছবি প্রকাশিত হওয়ায় সেই অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান মূলত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে পরিচালিত বলে ইসরায়েলের দাবি। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সামরিক অভিযানের মধ্যে বেসামরিক বসতি, ধর্মীয় প্রতীক ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সীমান্ত এলাকায় হামলা-পাল্টা হামলা, ড্রোন আক্রমণ ও স্থল তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
ঘটনাটি এমন সময় সামনে এল, যখন ভ্যাটিকানও দক্ষিণ লেবাননের খ্রিষ্টান সম্প্রদায় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, পোপ লিও চতুর্দশ দক্ষিণ লেবাননের রমেইশ, আইন এবেল, দবেল ও মারজাইউনের ১৩ জন ক্যাথলিক ও মারোনাইট যাজকের সঙ্গে আকস্মিক ভিডিও কলে কথা বলেছেন। তিনি শান্তির জন্য প্রার্থনার কথা জানান এবং বিপদের মধ্যেও যাজকদের নিজ নিজ সম্প্রদায়ের পাশে থাকার আহ্বান জানান।
সব মিলিয়ে, কুমারী মেরির মূর্তি অবমাননার নতুন ছবি দবেল গ্রামে ইসরায়েলি সেনাদের আচরণ নিয়ে আগের বিতর্ককে আরও গভীর করেছে। আইডিএফ অভিযুক্ত সেনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও স্থানীয়দের আস্থা ফেরাতে শুধু শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নয়, ধর্মীয় প্রতীক ও বেসামরিক সম্পদের সুরক্ষায় বাস্তব নিশ্চয়তা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল