রোহিঙ্গাদের সহায়তায় অস্ট্রেলিয়া-ইউনিসেফের ১৩৭ কোটি টাকার চুক্তি

রোহিঙ্গাদের সহায়তায় অস্ট্রেলিয়া-ইউনিসেফের ১৩৭ কোটি টাকার চুক্তি
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

রোহিঙ্গা সংকটের প্রায় এক দশক পূর্ণ হতে চলেছে। দীর্ঘ সময় ধরে কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরগুলোতে বসবাসরত লাখো রোহিঙ্গা শরণার্থীর মানবিক সংকটের মধ্যে আন্তর্জাতিক সহায়তা ক্রমেই কমে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে মানবিক সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে অস্ট্রেলিয়া।

রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে অস্ট্রেলিয়া সরকার ও জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর মধ্যে একটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় ১৬ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১৩৭ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে।

 

বুধবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল এবং বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন, ইউনিসেফ বাংলাদেশ এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

 

রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া সরকার ও ইউনিসেফের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এ সহযোগিতার জন্য অস্ট্রেলিয়া সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

 

মন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তার মতে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। ফলে এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

কোন খাতে ব্যয় হবে এই অর্থ?

অস্ট্রেলিয়ার দেওয়া এই অর্থ ইউনিসেফের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে।

এই তহবিল থেকে মূলত-

  • শিক্ষা কার্যক্রম
  • পুষ্টি সহায়তা
  • শিশু সুরক্ষা
  • নিরাপদ পানি সরবরাহ
  • স্যানিটেশন
  • স্বাস্থ্যবিধি (হাইজিন)
  • স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহায়তা

খাতে ব্যয় করা হবে। বিশেষ করে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত শিশুদের শিক্ষা ও পুষ্টি কার্যক্রমে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

 

আরও পড়ুন: কৃষিতে নীরব বিপ্লব ঘটাচ্ছে ‘কৃষি তথ্য সার্ভিস’

 

২০২৬-২০২৮ মেয়াদের বড় প্যাকেজের অংশ

এই চুক্তি মূলত অস্ট্রেলিয়ার ২০২৬ থেকে ২০২৮ মেয়াদের ৩৭০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বৃহৎ মানবিক সহায়তা কর্মসূচির অংশ। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে অবস্থানরত রোহিঙ্গা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য এই অর্থ ব্যয় করা হবে। অস্ট্রেলিয়া সরকারের তথ্য অনুযায়ী, নতুন এই তিন বছরের কর্মসূচির মাধ্যমে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি, স্যানিটেশন এবং সুরক্ষা খাতে সহায়তা দেওয়া হবে।

 

২০১৭ সাল থেকে ১০ হাজার কোটির বেশি সহায়তা

রাখাইনে সহিংসতার পর ২০১৭ সালে বাংলাদেশে বড় আকারে রোহিঙ্গা ঢল শুরু হয়। এরপর থেকে অস্ট্রেলিয়া ধারাবাহিকভাবে রোহিঙ্গা সংকটে সহায়তা দিয়ে আসছে। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় দেশটি ১.২৬ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত রোহিঙ্গা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং দুর্যোগপ্রবণ জনগণের জন্য ৫৫০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে দেশটি।

 

সংকটের নবম বছরে প্রবেশ করছে রোহিঙ্গা ইস্যু

বর্তমানে কক্সবাজারের ৩৩টি শিবিরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রায় ৫ লাখ ৬৮ হাজার মানুষও বিভিন্ন ধরনের মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মতে, এটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটগুলোর একটি।

 

বিশেষ করে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। শিশু বিয়ে, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, অপুষ্টি এবং শিক্ষার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

 

কমছে আন্তর্জাতিক তহবিল

রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়া। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সম্প্রতি সতর্ক করেছে যে, বিশ্বজুড়ে অন্যান্য সংকট বাড়তে থাকায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে অর্থায়ন কমছে।রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা বজায় রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক দেশ তাদের বৈদেশিক সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে।

 

ঝুঁকিতে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা

ইউনিসেফ সম্প্রতি সতর্ক করেছে যে অর্থসংকটের কারণে প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা শিশুর শিক্ষাজীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। শরণার্থী শিবিরে স্কুলমুখী শিশুদের একটি বড় অংশ ইউনিসেফ পরিচালিত শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অর্থায়ন কমে যাওয়ায় কিছু শিক্ষা কার্যক্রম ইতোমধ্যে সংকুচিত করতে হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হলে একটি পুরো প্রজন্ম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

 

শিশু ও নারীদের জন্য বড় সহায়তা

অস্ট্রেলিয়ার নতুন অর্থায়নকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন মানবিক সহায়তা সংশ্লিষ্টরা। কারণ এই অর্থ শুধু খাদ্য বা আশ্রয়ের জন্য নয়, বরং শিশু সুরক্ষা, শিক্ষা, পুষ্টি এবং স্বাস্থ্য খাতেও ব্যয় হবে। ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং প্রায় ১৯ লাখ শিশু বিভিন্ন ধরনের মানবিক সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছে।

 

সুসান রাইল কী বললেন

বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল বলেছেন, এই বহুবর্ষী বিনিয়োগের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া জীবন রক্ষা, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা এবং বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর সহনশীলতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে চায়। তার মতে, নিরাপত্তা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতির কারণে রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি এবং নমনীয় অর্থায়ন প্রয়োজন।

 

প্রত্যাবাসন এখনও বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ সরকার বারবার বলছে, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারে নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের মধ্যেই রয়েছে। তবে মিয়ানমারের চলমান অস্থিতিশীলতা, রাখাইন পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা সংকটের কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এখনও অগ্রগতি পায়নি। ফলে কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে লাখো রোহিঙ্গার জীবন এখনও আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

 

নতুন এই ১৬ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারের সহায়তা সেই দীর্ঘ মানবিক সংকট মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে যখন বৈশ্বিক অর্থায়ন কমছে, তখন বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য এই সহায়তা নতুন আশার বার্তা হয়ে এসেছে।


সম্পর্কিত নিউজ