৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকায় ধসে পড়তে পারে ৭২ হাজার ভবন

৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকায় ধসে পড়তে পারে ৭২ হাজার ভবন
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভূতাত্ত্বিক অবস্থান, দীর্ঘদিন বড় ভূমিকম্প না হওয়া, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল ভবন ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশ, বিশেষ করে ঢাকা, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ নগরী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘন ঘন ভূমিকম্প বড় কোনো দুর্যোগের পূর্বাভাস না হলেও এটি ভূমিকম্প ঝুঁকির বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। গত দেড় বছরে দেশে ৫২টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩৯টির উৎপত্তি দেশের অভ্যন্তরে। রিখটার স্কেলে এসব ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ২ দশমিক ৫ থেকে ৫ দশমিক ৭ পর্যন্ত।

 

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি আটটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে সিলেটে। নরসিংদীতে পাঁচটি এবং রংপুরে চারটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। এছাড়া ভারত সীমান্ত, ভুটান ও মিয়ানমার অঞ্চলেও কয়েকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে, যার কম্পন বাংলাদেশে অনুভূত হয়েছে।

 

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির বলেন, ২০১৫-১৬ থেকে ২০২০-২১ সাল পর্যন্ত দেশে বছরে গড়ে ১০টির কম ভূমিকম্প হতো। কিন্তু গত দুই থেকে তিন বছরে এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাঁর মতে, প্রায় ১৫০ বছর ধরে এ অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প না হওয়ায় একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

 

সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (সিডিএমপি) জরিপে বলা হয়েছে, ঢাকায় সাত মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানলে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। গ্যাসলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ডও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বহুদিন ধরেই বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। তাঁর মতে, এই অঞ্চলে গড়ে প্রতি ১৫০ বছরে সাত মাত্রার এবং ২৫০ থেকে ৩০০ বছরে আট মাত্রার ভূমিকম্প ঘটতে পারে। ১৭৬২ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলে একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল, কিন্তু গত একশ থেকে দেড়শ বছরে বড় কোনো ভূমিকম্প হয়নি।

 

তিনি আরও বলেন, রাজউকের আওতাধীন প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা নরম ও ভরাট মাটির ওপর অবস্থিত। ফলে এসব এলাকায় ভূমিকম্পের অভিঘাত বেশি হতে পারে। তাঁর মতে, মাটি উন্নয়ন, বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন এবং ভূমিকম্প সহনশীল ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করা জরুরি।

 

রাজউকের হিসাব অনুযায়ী, তাদের আওতাধীন এলাকায় প্রায় ২১ লাখ ভবনের মধ্যে ছয় লাখের বেশি বহুতল ভবন রয়েছে। এর উল্লেখযোগ্য অংশ জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করে নির্মাণ করা হয়নি। সাম্প্রতিক মূল্যায়নে ঢাকার অন্তত ৩০০টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে রাজউক।

 

২০২৫ সালে নরসিংদীকেন্দ্রিক ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ভূমিকম্পগুলোর একটি। এতে অন্তত ১০ জন নিহত এবং ৬০০-এর বেশি মানুষ আহত হন। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ভবনে ফাটল, দেয়াল ধস এবং ব্যাপক আতঙ্কের ঘটনা ঘটে।

 

আন্তর্জাতিক গবেষকরাও বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যামন্ট-ডোহার্টি আর্থ অবজারভেটরির গবেষকরা বলেছেন, বাংলাদেশ অঞ্চলের নিচে দীর্ঘদিন ধরে টেকটোনিক চাপ জমা হচ্ছে এবং কয়েকশ বছর ধরে বড় ধরনের শক্তি মুক্ত না হওয়ায় ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা রয়েছে।

 

কয়েকজন ভূকম্পবিদের মতে, মধুপুর ফল্ট ও ডাউকি ফল্ট বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকম্প উৎসগুলোর মধ্যে অন্যতম। মধুপুর ফল্টে ৬ দশমিক ৫ থেকে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প ঘটলে ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কিছু গবেষণায় ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকায় কয়েক লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্প ঠেকানোর কোনো উপায় নেই, তবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। সেজন্য জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্তকরণ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো সুরক্ষা, নিয়মিত মহড়া এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

 

ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ ভূমিকম্প আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, ভূমিকম্পের ঝুঁকি কেবল দূরের কোনো দেশের সমস্যা নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ভূমিকম্প কবে হবে তা কেউ বলতে না পারলেও বাংলাদেশকে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে, কারণ দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতিই হতে পারে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।


সম্পর্কিত নিউজ