যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো সময় যুদ্ধ শুরু, ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’ তেহরান: ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো সময় যুদ্ধ শুরু, ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’ তেহরান: ইরান
ছবির ক্যাপশান, ফাইল ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ আবারও শুরু হতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইরানের সামরিক বাহিনী। তেহরানের দাবি, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ও ওয়াশিংটনের অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র কোনো চুক্তি বা কূটনৈতিক বোঝাপড়ার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়।

এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন পক্ষের যেকোনো “দুঃসাহসিকতা বা বোকামির” জবাব দিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক নেতৃত্ব। আল জাজিরার লাইভ আপডেটে ইরানের সামরিক বাহিনীর এই সতর্কবার্তা প্রকাশিত হয়েছে।

 

ইরানের ফারস নিউজ এজেন্সির বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ইরানের সামরিক সদর দপ্তরের উপপ্রধান মোহাম্মদ জাফর আসাদি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা “প্রবল”। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও পদক্ষেপ প্রমাণ করে, ওয়াশিংটন কোনো চুক্তি, বোঝাপড়া বা আন্তর্জাতিক নিয়মের প্রতি যথাযথভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়। আসাদি আরও বলেন, মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য মূলত “মিডিয়া-চালিত”; একদিকে তারা তেলের দাম কমে যাওয়া ঠেকাতে চায়, অন্যদিকে নিজেরাই যে সংকট তৈরি করেছে, সেখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে।

 

আলোচনায় নমনীয়তা দেখিয়েও ফল পায়নি তেহরান

ইরানের সামরিক মূল্যায়ন হলো, যুদ্ধ শুরুর আগের আলোচনা থেকে শুরু করে যুদ্ধবিরতি পর্যন্ত তেহরান বিভিন্ন পর্যায়ে নমনীয়তা দেখিয়েছে। কিন্তু তার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, যখনই তেহরান কোনো দাবি নরম করেছে বা সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়েছে, ওয়াশিংটন সেটিকে আলোচনার সুযোগ হিসেবে না দেখে নতুন চাপ তৈরির পথ হিসেবে ব্যবহার করেছে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে ইরান একটি নতুন প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠায়। রয়টার্স জানিয়েছে, ওই প্রস্তাবে ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আলোচনা শুরু করতে রাজি ছিল, তবে তার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মতো বিষয় আগে সমাধানের কথা বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পরবর্তী ধাপে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন।

 

ট্রাম্প বলছেন যুদ্ধ শেষ, কিন্তু বাস্তবে অচলাবস্থা

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি শত্রুতা শেষ হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ মে কংগ্রেসে পাঠানো চিঠিতে ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ “terminated” বা শেষ হয়েছে। তার যুক্তি, ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বাহিনীর মধ্যে আর সরাসরি গোলাগুলি হয়নি। এই বক্তব্য আসে যুক্তরাষ্ট্রের War Powers Resolution অনুযায়ী ৬০ দিনের সময়সীমা পূর্ণ হওয়ার দিনে, যেখানে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের প্রশ্ন ওঠে।

 

তবে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা ও সমালোচকেরা ট্রাম্পের দাবি মানছেন না। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিরোধী আইনপ্রণেতারা বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নৌ অবরোধ, হরমুজ ঘিরে সামরিক উপস্থিতি এবং অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মোতায়েন অব্যাহত থাকলে যুদ্ধকে পুরোপুরি শেষ বলা যায় না। ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, প্রয়োজন হলে আবার সামরিক হামলা হতে পারে-যা নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

 

হরমুজ প্রণালি ও নিষেধাজ্ঞা বড় বাধা

ইরান এখন চাইছে, পারমাণবিক কর্মসূচির মতো বড় ও জটিল প্রশ্নে যাওয়ার আগে হরমুজ প্রণালির বর্তমান অচলাবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা-অবরোধের বিষয়গুলো সমাধান হোক। তেহরানের দাবি, হরমুজ প্রণালি ও বন্দর অবরোধের মতো চাপের মধ্যে বসে পারমাণবিক আলোচনায় যাওয়া মানে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে আলোচনায় বসা। ওয়াশিংটন অবশ্য এই অবস্থান মানতে রাজি নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য, যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা এবং হরমুজ-সবকিছুই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তৃত ও বাধ্যতামূলক চুক্তির সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে।

 

আরো পড়ুন : যুদ্ধবিরতির মধ্যেই লেবাননে ইসরায়েলি হামলা, শিশুসহ নিহত অন্তত ১২

 

ভারতীয় এক্সপ্রেসের লাইভ আপডেটে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র শিপিং কোম্পানিগুলোকেও সতর্ক করেছে-ইরানকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে পারাপারের জন্য কোনো ধরনের অর্থ, টোল বা অন্য সুবিধা দিলে তারা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে। এতে বোঝা যায়, আলোচনার পাশাপাশি ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক চাপও বজায় রাখছে।

 

‘আত্মসমর্পণ নয়’, বলছে ইরান

ইরানের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার ভাষা মূলত সমঝোতার নয়, বরং “আত্মসমর্পণের” দাবি। তেহরান মনে করছে, ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতির পরও নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ, পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ে শর্ত এবং হরমুজে চাপ বজায় রেখে ইরানকে এমন অবস্থানে ঠেলে দিতে চাইছে, যেখানে তাদের কৌশলগত ছাড় দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

 

ইরানের সামরিক বাহিনীর নতুন সতর্কবার্তা তাই শুধু প্রতিরক্ষামূলক বিবৃতি নয়; এটি ওয়াশিংটনের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা বলেও দেখা হচ্ছে। তেহরান জানাতে চাইছে, তারা আলোচনায় আগ্রহী হলেও সামরিক চাপের মুখে কোনো চুক্তি মেনে নেবে না। একই সঙ্গে যুদ্ধের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হলে তার জন্য প্রস্তুত থাকার বার্তাও দেওয়া হচ্ছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও যুদ্ধ নিয়ে চাপ বাড়ছে

ইরান সংঘাত ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অভ্যন্তরীণ চাপও তৈরি করেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, যুদ্ধের জনপ্রিয়তা কমছে, তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে এবং কংগ্রেসে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে। রিপাবলিকানরা এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের পাশে থাকলেও ডেমোক্র্যাটরা বলছেন, স্পষ্ট কৌশল ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে আটকে যাচ্ছে।

 

আরো পড়ুন : জার্মানি থেকে ৫ হাজার সেনা সরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

 

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলে দাবি করলেও আইন বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার সংগঠন এবং ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা মনে করছেন, কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে ইরানবিরোধী সামরিক চাপ ধরে রাখা সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি করছে।

 

সামনে কী হতে পারে

বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ইরান নতুন করে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয় কি না, অথবা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল আবার হামলা শুরু করে কি না। দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালি ও নৌ অবরোধ নিয়ে কোনো বাস্তব সমঝোতা হয় কি না। তৃতীয়ত, পাকিস্তানসহ মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে আলোচনার পথ খোলা থাকে কি না।

 

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরান তার প্রস্তাবে হরমুজ খুলে দেওয়া এবং অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়টি পারমাণবিক আলোচনার আগে সমাধান করতে চেয়েছিল, কিন্তু ট্রাম্প তা গ্রহণ করেননি। এই অচলাবস্থা চলতে থাকলে যুদ্ধবিরতি কাগজে টিকে থাকলেও সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি থেকে যাবে।

 

ইরানের সামরিক বাহিনীর সতর্কবার্তা দেখাচ্ছে, তেহরান এখন যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী শান্তি হিসেবে দেখছে না। বরং দেশটির ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র চাপ বাড়িয়ে একটি অসম চুক্তি চাপিয়ে দিতে চাইছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, ইরান সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং এখন চুক্তি করতে বাধ্য।

 

এই দুই বিপরীত অবস্থানের মাঝখানে হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং নৌ অবরোধ-সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে আছে। আলোচনার পথ খোলা থাকলেও সামরিক প্রস্তুতির ভাষা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। তাই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হবে কি না, তা এখন নির্ভর করছে কূটনৈতিক ছাড়, সামরিক সংযম এবং হরমুজ সংকটের দ্রুত সমাধানের ওপর।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা


সম্পর্কিত নিউজ